ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহী হলে পারমাণবিক চুক্তির জন্য সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান প্রস্তুত আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অবশ্য বারবার বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ইরানই আলোচনার প্রক্রিয়া থামিয়ে রেখেছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তির পক্ষে, কিন্তু ইরানের সাথে এটি করা খুবই কঠিন।
তবে তেহরানে মাজিদ তাখত-রাভানচি বলেছেন, ‘বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে যে তারা চুক্তি চায় কি-না। তারা আন্তরিক হলে আমি নিশ্চিত আমরা সমঝোতার দিকেই এগিয়ে যাব।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছেন।
ইরানে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভের সময় সারাদেশে বিক্ষোভ সহিংস দমনের পর তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ফেব্রুয়ারির শুরুতে উপসাগরীয় দেশ ওমানে পরোক্ষভাবে বৈঠক করে। তাখত-রাভানচি নিশ্চিত করেছেন যে দ্বিতীয় দফার বৈঠক মঙ্গলবার জেনেভায় হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, আলোচনা কমবেশি ইতিবাচক দিকেই এগিয়েছে, তবে এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। ট্রাম্পও এসব আলোচনাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তেহরান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা সমঝোতা বিষয়ে তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ।
পারমাণবিক অস্ত্র মানের প্রায় কাছাকাছি এই মাত্রার সমৃদ্ধকরণের কারণে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে- এমন সন্দেহ আরো বাড়িয়েছে। যদিও ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছে।
তাখত-রাভানচি বলেন, ‘তারা যদি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত থাকে, তবে আমরা আমাদের কর্মসূচি-সংক্রান্ত এবং অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত আছি।’
তবে তিনি এটি নিশ্চিত করেননি যে তারা পুরো নিষেধাজ্ঞা নাকি কিছু বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলছেন।
ইরান ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতো এবারো ৪০০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশের বাইরে পাঠাতে রাজি হবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তাখত-রাভানচি বলেন, ‘আলোচনার প্রক্রিয়ায় কী ঘটবে তা বলার সময় আসেনি।’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে ২০১৫ সালের বহুপক্ষীয় চুক্তির অংশ হিসেবে নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ১১ হাজার কেজি ইউরেনিয়াম গ্রহণ করেছিল রাশিয়া।
তিন বছর পর সেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। এখন রাশিয়া আবারো এই দ্রব্যটি গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে।
এর বাইরে গণমাধ্যমে খবর এসেছে যে ইরান আপাতত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, আলোচনাটি যেন কেবল পারমাণবিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে। এ প্রসঙ্গে তাখত-রাভাঞ্চি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে যদি চুক্তি করতে চান, তবে পারমাণবিক ইস্যুতেই দৃষ্টি দিতে হবে।’
এটি নিশ্চিত হলে ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ ওয়াশিংটনের ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’-সংক্রান্ত কঠোর দাবি ইরান সবসময়ই চুক্তির পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
ইরান এটিকে তাদের জন্য একটি রেড লাইন বলে মনে করে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির অধীনে তাদের অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে বিবেচনা করে।
তাখত-রাভানচি বলেন, ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি কোনো ইস্যু নয় এবং এটি আর আলোচনার টেবিলে নেই।’
যদিও ট্রাম্প শুক্রবারও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা কোনো সমৃদ্ধকরণ চাই না।’
ইরানের আলোচক আরো বলেছেন, তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন আলোচকদের সঙ্গে আলোচনায় রাজি নয়।
এটি ইসরাইলের একটি প্রধান দাবি ছিল, কারণ দেশটি ইরানের এসব ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু।
তাখত-রাভানচি বলেন, যখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের আক্রমণ করে তখন ক্ষেপণাস্ত্রই তাদের সুরক্ষা দেয়। ‘সুতরাং আমরা কিভাবে আমাদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি গ্রহণ করব,’ বলেছেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তির উপাদানের মধ্যে ইরানের নাগরিকদের প্রতি আচরণকেও অন্তর্ভুক্ত বলে মন্তব্য করেছেন।
এছাড়া সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প যে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহায়তা আসছে কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিন বলে যেসব বার্তা দিয়েছিলেন, তারও সমালোচনা করেছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করি।’
এক দশকেরও বেশি আগে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তাখত-রাভানচি এবারের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুনছি যে তারা আলোচনায় আগ্রহী। তারা এটি প্রকাশ্যে এবং ওমানের মাধ্যমেও গোপনে বলেছে যে তারা এসব বিষয় শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে আগ্রহী।’
যদিও ট্রাম্প বলেছেন, তারা আবারো ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনে নজর দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এটাই মনে হয় সবচেয়ে ভালো বিষয় হতে পারে।’
সূত্র : বিবিসি



