যুক্তরাষ্ট্র কি ভারত-চীন উষ্ণ সম্পর্কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতা শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়, বরং মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
শি জিনপিং ও মোদি
শি জিনপিং ও মোদি |আল জাজিরা

ভারত ও চীনের উষ্ণ সম্পর্ক শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতেও নতুন মাত্রা যুক্ত করছে। এ অবস্থায় ওয়াশিংটনের কৌশল, বিশেষত কোয়াড জোটকে কেন্দ্র করে নেয়া পদক্ষেপগুলো জটিলতার মুখে পড়তে পারে।

১৮ আগস্ট ফিনান্সিয়াল টাইমস-এ লেখা এক নিবন্ধে হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য ও উৎপাদনবিষয়ক কাউন্সিলর পিটার নাভারো স্পষ্ট করেন, বাইডেন প্রশাসন এই কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অন্যভাবে দেখেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি মুখোমুখি হচ্ছে। তার মতে, ‘ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হতে চায়, তবে তাদেরও সেভাবে আচরণ শুরু করতে হবে।’

কিন্তু ভারতীয় কর্মকর্তারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নয়াদিল্লি তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ থেকে সরে আসবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে নয়াদিল্লি সরাসরি কোনো একপক্ষীয় শিবিরে যোগ দেবে না।

চীন-ভারত ঘনিষ্ঠতা ও বৈশ্বিক ভারসাম্য

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) চীনা গবেষণার অধ্যাপক বি আর দীপক আল জাজিরাকে বলেন, ‘ভারত-চীন সম্পর্ক উষ্ণ হলে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চীনকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টা জটিল হয়ে উঠবে।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, যদি নয়াদিল্লি উন্নয়ন অর্থায়ন, বহুপাক্ষিক সংস্কার, ডলারের অবনতি বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে বেইজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে তা ওয়াশিংটনের গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র বয়ানকে দুর্বল করে দেবে এবং বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার জন্য চীনের প্রচেষ্টাকে বৈধতা দেবে।

কোয়াডের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

বিশ্লেষক দীপক আরো বলেন, দিল্লি-বেইজিং ঘনিষ্ঠতা কোয়াডের মধ্যে ভারতের চীনবিরোধী অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। এতে কোয়াড একটি কড়া চীনবিরোধী ব্লক হিসেবে কাজ না করে বরং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জনসাধারণের পণ্য সরবরাহ, জলবায়ু সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের মতো বৃহত্তর এজেন্ডার দিকে ঝুঁকবে।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লিদারেভ বলেন, ভারত-চীন সম্পর্ক কোয়াডের ভেতরে ‘জটিলতা সৃষ্টি করবে, যা সংস্থাটির পারস্পরিক আস্থা ও উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করবে।

তবে দীপক মনে করেন, কোয়াডের ‘কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতা’ অক্ষুণ্ণ থাকবে। কারণ, স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল, উদীয়মান প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো যৌথ লক্ষ্য কোয়াডকে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রাখবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিধা ও আঞ্চলিক বাস্তবতা

মার্কিন বিশ্লেষক হাশমি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কোয়াডকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিলেও বর্তমানে তার নীতিই এর সংহতিকে দুর্বল করছে। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রেসিডেন্টের কাছে অগ্রাধিকার বলে মনে হচ্ছে না।’

তবে তিনি সতর্ক করেন, যদি হোয়াইট হাউস নীতিতে পরিবর্তন আনে, তখন আঞ্চলিক বাস্তবতাও বদলে যাবে। বিশেষত, ভারতকে চীনবিরোধী কোনো জোটে টেনে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতা শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়, বরং মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটনের গণতন্ত্রভিত্তিক বয়ান ও কোয়াড-কেন্দ্রিক উদ্যোগ তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন নয়াদিল্লি একপক্ষীয় অবস্থান নিতে রাজি হবে। কিন্তু ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতি বজায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় চীনকে প্রতিহত করার কৌশল অনেকটাই দুরূহ হয়ে উঠবে।

সূত্র : আল জাজিরা