ইরান-মার্কিন পরমাণু সমঝোতায় কি ভূমিকা রাখবে পাকিস্তান?

নয়া দিগন্ত অনলাইন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সাথেপরমাণু চুক্তি সম্পাদনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হেলিকপ্টারে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তার কণ্ঠে শোনা গেল ইরান যুদ্ধ নিয়ে এ যাবতকালের সবচেয়ে ইতিবাচক আশাবাদ। সাংবাদিকদের তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, ইরানের সাথেপরমাণু চুক্তি সম্পাদনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্পের দাবি, ইরান তাদের মাটির নিচে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে। এমনকি এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে তিনি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফরের ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন।

পাশাপাশি তেহরান দেখাচ্ছে একই মুদ্রার উল্টো পিঠ। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তার আদান-প্রদান চললেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার কোনো প্রশ্নই আসে না।

আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পাকিস্তান কীভাবে এই দুই বৈরী দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছে এবং কেন এই আলোচনার গতিপথ এখনো অমীমাংসিত রহস্যে ঘেরা।

ইসলামাবাদের কূটনৈতিক তৎপরতা ও মধ্যস্থতার কেন্দ্রবিন্দু

গত তিন দিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশ সফর করেছেন। একই সময়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে সফর করে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সেরেছেন।

আল জাজিরার তথ্যমতে, ইসলামাবাদে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের প্রতিনিধিদের যে আলোচনা হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় তেহরানে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন আসিম মুনির। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কারোলাইন লেভিটও স্বীকার করেছেন যে, পাকিস্তান এই প্রক্রিয়ায় ‘অসাধারণ’ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। তবে সাবেক কূটনীতিক আসিফ দুররানি সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তান কেবল পথ দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুই পক্ষকেই।

ট্রাম্পের দাবি বনাম তেহরানের বাস্তবতা

ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান তাদের সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে দিতে রাজি হয়েছে, যা গত বছরের জুনে মার্কিন বি-২ বোম্বার হামলার পর ভূগর্ভে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাফ জানিয়েছেন, সার্বভৌম অধিকার হিসেবে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সৈয়দ মুজতবা জালালজাদেহ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য সম্ভবত আলোচনার একটি ‘সর্বোচ্চ পাঠ’ বা কৌশলগত চাপ। অন্যদিকে, ইরানের কট্টরপন্থী নেতারা যুদ্ধের জন্যও নিজেদের প্রস্তুতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। আইআরজিসি-এর সাবেক কমান্ডার মোহসিন রেজাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ভয় পান না।

লেবানন ফ্যাক্টর ও যুদ্ধবিরতির সমীকরণ

এই আলোচনার পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা। ইরান শুরু থেকেই শর্ত দিয়ে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথেকোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে লেবানন পরিস্থিতির সমাধান জরুরি। ইরানি স্পিকার কালিবাফ বলেছেন, লেবাননের শান্তি ইরানের কাছে নিজের দেশের শান্তির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্লেষক গ্রেস ওয়ারমেনবোল মনে করেন, এই যুদ্ধবিরতি কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে, কারণ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বারবার সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধান চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন।

লক্ষ্য যখন বারবার বদলে যায়

ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের সুর ছিল ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’। এরপর পাকিস্তান যে ১৫ দফার প্রস্তাব তেহরানে পাঠিয়েছিল, তাতেও ছিল কঠোর শর্ত। কিন্তু বর্তমান আলোচনায় সেই প্রক্সি গ্রুপ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য এই কর্মসূচি স্থগিত চায়, যেখানে ইরান বলছে পাঁচ বছরের কথা। বিশ্লেষক সাহার খান মনে করেন, এটি আসলে ২০১৫ সালের জেসিপিওএ সমঝোতার একটি ভিন্নরূপ মাত্র।

দিনশেষে ২২ এপ্রিলের সময়সীমার মধ্যে কোনো বড় ঘোষণা আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব। ইসলামাবাদে বিদেশী সাংবাদিকদের ভিড় আর নিরাপত্তা কড়াকড়ি ইঙ্গিত দিচ্ছে—বড় কিছু ঘটার সম্ভাবনা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

সূত্র : আল জাজিরা