গাজা যুদ্ধে ইহুদিবাদী সেনাবাহিনী এবং মন্ত্রিসভার ‘বিশাল বিজয়‘-এর মিথ্যা স্লোগান প্রচার এবং হামাসের শক্তি ধ্বংস করার দাবি সত্ত্বেও ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আরেকটি বাস্তবতা প্রতিফলিত করে এবং যুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীর বড় সঙ্কট প্রকাশ করছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ বাহিনী পরিচালিত অপারেশন আল-আকসা ফ্লাডের পরে এই ঘটনাটি উল্লেখযোগ্যভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পার্সটুডে জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই এবং যদিও ইহুদিবাদী সেনাবাহিনী শাসকগোষ্ঠীর মিডিয়ার উপর কঠোর সামরিক সেন্সরশিপের নীতি আরোপ করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও আত্মহত্যা উভয়টির হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশের অনুমতি দেয় না, হিব্রু সূত্রগুলো বারবার ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে আত্মহত্যার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে সাম্প্রতিকতম আত্মহত্যার ঘটনা যা মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে তা হলো দখলদার বাহিনীর রিজার্ভ সৈনিক আরিয়েল তামানের, যিনি অধিকৃত দক্ষিণ ফিলিস্তিনে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেছিলেন। এই ইহুদিবাদী সৈনিক ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মৃত সৈন্যদের লাশ শনাক্তকরণ ইউনিটে কাজ করতেন, যা মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে সবচেয়ে কঠিন মিশনগুলোর মধ্যে একটি। ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠীর চ্যানেল ১২ টেলিভিশন জানিয়েছে, শুধুমাত্র জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় আরো চারজন ইসরাইলি সৈন্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসরাইলি সৈন্যরা কেন আত্মহত্যার কথা ভাবে?
আরব দেশগুলোর সাথে বিশেষ করে ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে এই শাসক গোষ্ঠী যে অন্তহীন যুদ্ধ চালিয়েছে তার বিভিন্ন সময়কালে ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠীর সৈন্যরা এমন অপরাধ করেছে যা নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার দিক থেকে যে কোনও মানুষের কাছে অকল্পনীয় এবং বোধগম্য নয়। স্বাভাবিকভাবেই এই অপরাধের একটি ছোট অংশের ছবি দেখলেও ব্যক্তিদের গুরুতর মানসিক ক্ষতি হয়; কিন্তু ইহুদিবাদী সৈন্যরা এই অপরাধ করার পরে কেবল প্রভাবিত হয় না এবং অনুশোচনা বোধ করে না, বরং তারা এই বর্বরতার জন্য গর্বিত হয় এবং মিডিয়া এবং সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোতে এর ছবি প্রকাশ করে। গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই এই শাসকগোষ্ঠীর গণমাধ্যমে ইহুদি সৈন্যদের মানসিক ব্যাধি এবং আঘাত সম্পর্কে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে; তবে এটা স্পষ্ট যে ইহুদি দখলদার বাহিনীর মানসিক উত্তেজনা নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে তাদের অপরাধের জন্য অনুশোচনার কারণে নয়, বরং প্রতিরোধের ফলে তারা যে ভারী এবং নজিরবিহীন আঘাত ভোগ করে তার কারণে।
ইহুদি সেনাবাহিনীর রিজার্ভ বাহিনীর মধ্যে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মানসিক আঘাত, দখলদার শাসক গোষ্ঠীর অন্যান্য অফিসার এবং সৈন্যদের তুলনায় বেশি স্পষ্ট। এই প্রসঙ্গে ইহুদি লেখক এবং মানসিক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ‘রাভিটাল হোফিল‘ নিয়মিতভাবে দখলদার সেনাবাহিনীর জন্য রিজার্ভ বাহিনী হিসেবে কাজ করা ইহুদি সৈন্যদের মানসিক আঘাত পরীক্ষা করার জন্য একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এই নিবন্ধের একটি অংশে বলা হয়েছে, নিয়মিত সেনা বাহিনী ভেবেছিল যে করোনা মহামারীর তিন বছর পর, সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত ছিল; কিন্তু হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং আমরা এমন দৃশ্য দেখতে পেলাম যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব ছিল। ইসরাইলি বাহিনীর জন্য চলমান প্রাণহানির পাশাপাশি, এই যুদ্ধের মানসিক ক্ষতি বিশাল, এমনকি যারা বেঁচে আছেন তারাও মনে করেন যে তাদের জীবন শেষ হয়ে গেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক প্রধান ইয়াল ফ্রোচার বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতি উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, ‘রিজার্ভ সৈন্যরা অনেক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়, যার মধ্যে রয়েছে তাদের চাকরি ও পারিবারিক জীবনের ধ্বংস, বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি এবং যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা।‘
ইসরাইলি মনোবিজ্ঞানী রোনা অ্যাকারম্যান বলেন, যুদ্ধ দৃশ্যমান ক্ষত রেখে যায় এবং মানসিক ক্ষতি দীর্ঘকাল ধরে থাকে, বিশেষ করে সৈন্যদের মধ্যে, কারণ তাদের নিজেদের শক্তিশালী দেখাতে হয় এবং তাই তাদের মানসিকতায় যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে তা চিনতে পারা খুবই কঠিন; এমনকি এটি আত্ম-ক্ষতির পর্যায়ে পৌঁছে এবং এই সৈন্যদের মধ্যে অনেকেই আত্মহত্যা করে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সম্পর্কে সেন্সর করা সংবাদের মধ্যে ইসরাইলি কান চ্যানেল বলেছে যে ২০২৫ সালের শুরু থেকে ১৬ জন ইসরাইলি সৈন্য আত্মহত্যা করেছে। ২০২৪ সালে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে ২১ জন আত্মহত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ১৭ জন ছিল।
সূত্র : পার্সটুডে



