ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা নয় : ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে আসবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, এটি ইরানের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বিষয় এবং এ নিয়ে কোনো আপস সম্ভব নয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে আসবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, এটি ইরানের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বিষয় এবং এ নিয়ে কোনো আপস সম্ভব নয়।

শুক্রবার ওমানের মাসকাটে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনার পর শনিবার আল জাজিরাকে নেয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

তিনি জানান, আলোচনাটি পরোক্ষ হলেও মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তার ভাষায়, আলোচনা “ভালো একটি শুরু”, তবে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে “এখনো অনেক পথ বাকি”।

অন্যদিকে, ইরানের রাজধানী তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদ তুলনামূলক কম।

“আমার মনে হয় আগের মতোই এই আলোচনাও ফলহীন হবে। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়, কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়,”—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী আল জাজিরাকে বলেন।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল-শায়জি বলেন, নতুন কোনো চুক্তি হলে তিনি খুশি হবেন, তবে বাস্তবতা তাকে আশাবাদী হতে দিচ্ছে না।

কাতারের রাজধানী দোহায় আয়োজিত আল জাজিরা ফোরাম থেকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং ইসরায়েলের উসকানিতে ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়াতে চাইছে। ওয়াশিংটনের ধারণা, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ইরান দুর্বল অবস্থানে রয়েছে, ফলে সহজেই তাদের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা সম্ভব।

অপরিবর্তনীয় অধিকার

শুক্রবার আলোচনাকে “খুব ভালো” বললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার থেকে কার্যকর একটি নির্বাহী আদেশে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে বেশ কয়েকটি জাহাজ ও শিপিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ছিল চীনের সঙ্গে। ওই বছর চীন থেকে ইরানের আমদানি ছিল প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

আরাগচি বলেন, পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ ইরানের “অপরিবর্তনীয় অধিকার” এবং এটি অব্যাহত থাকবে। তবে তিনি যোগ করেন, সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে একটি আশ্বস্তকারী চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান প্রস্তুত। তার ভাষায়, “ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।”

তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত হওয়ায় এটি আলোচনার বাইরে থাকবে।

মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নেয়া সমর্থন আলোচনার আওতায় আনতে চায়। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলও এসব বিষয় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে তেহরান বরাবরই পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে আলোচনার পরিসর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

আল-শায়জি বলেন, “ইরান যেমন কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও নয়। ফলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পক্ষে দুই পক্ষকে কাছাকাছি আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।”

গত বছর ইসরায়েলের নজিরবিহীন বোমা হামলার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনা ভেঙে পড়ে এবং তা ১২ দিনের যুদ্ধে রূপ নেয়। শুক্রবারের আলোচনা ছিল সেই সংঘাতের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ।

গত মাসে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি আরও জোরদার করে এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করে।

শক্তির মাধ্যমে শান্তি

ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার শনিবার আরব সাগরে অবস্থানরত ওই রণতরী পরিদর্শন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইটকফ বলেন, রণতরী ও তার স্ট্রাইক গ্রুপ “আমাদের নিরাপদ রাখছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নীতির বার্তা বহন করছে।”

তিনি আরও জানান, মঙ্গলবার রণতরীর কাছে “অস্পষ্ট উদ্দেশ্যে” এগিয়ে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা পাইলটের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন।

তবে আল-শায়জি মনে করেন, সামরিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে না। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

এদিকে, ইরান ইস্যুতে আলোচনার জন্য আগামী বুধবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, তিনি চান যেকোনো আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকুক।

১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।

আরাগচি আশা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটন যদি হুমকি ও চাপের নীতি থেকে সরে আসে, তবে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

সূত্র : আল জাজিরা।