গাজার শরণার্থী শিবিরে চর্মরোগের মহামারি

গাজা উপত্যকার শরণার্থী শিবিরগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অতিরিক্ত ভিড় ও চিকিৎসা সঙ্কটে চর্মরোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

গাজা উপত্যকার শরণার্থী শিবিরগুলোতে চর্মরোগের এক ভয়াবহ বিস্তার দেখা দিয়েছে, যা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এক ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া বাড়ার সাথে সাথে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

গাজা সিটি থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জাতিসঙ্ঘ একটি নতুন জনস্বাস্থ্য সঙ্কটের সতর্কবাণী দিয়েছে। উপত্যকার ঘিঞ্জি শিবিরগুলোতে চর্মরোগ এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে সামনে গরমের দিনগুলোতে এই অবস্থা আরো শোচনীয় হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কাজ করা জাতিসঙ্ঘের সংস্থা আনরোয়া জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে চর্মরোগে আক্রান্তের সংখ্যা তিন গুণ বেড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ভিড়, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম অবনতির কারণে খুজলি বা স্ক্যাবিস, জলবসন্ত এবং আরো নানা সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই রোগের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে নিস্পাপ শিশুরা।

আসন্ন গ্রীষ্ম নিয়ে ফিলিস্তিনি পরিবার এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ভীষণ আতঙ্কে আছেন। তারা ২০২৪ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতির পুনরাবৃত্তি চান না, যখন গাজায় অন্তত দেড় লাখ মানুষ চর্মরোগে ভুগেছিল। এই সঙ্কটের মূল কারণ ছিল গাজার ওপর ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ, যার ফলে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় একটি তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চলছে, কিন্তু ইসরাইল এখনো সেখানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইসরাইল এমন এক কঠোর অবরোধ বজায় রেখেছে যার ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ভেতরে ঢুকতে পারছে না। এই অমানবিক অবরোধই সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।

গাজার একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ফৌজি আল-নাজ্জার নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা পুরো উপত্যকা-জুড়ে একটু আশ্রয়ের খোঁজ করেছি, কিন্তু সব জায়গাই বাস্তুচ্যুত মানুষে ঠাসা। এক মিলিয়ন মানুষ একে অপরের গায়ের ওপর কোনোমতে টিকে আছে।

আমরা এখানে আবর্জনার স্তূপের ওপর থাকতে বাধ্য হচ্ছি। এটি একটি বিশাল সমস্যা। আমাদের কী করার আছে? কুকুর, বিড়াল, মাছি আর ইঁদুরের সাথে আমাদের বসবাস। এই দেখুন আমার হাতের অবস্থা! নিজের শরীরের ক্ষত দেখিয়ে তিনি আর্তনাদ করছিলেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় আল-নাজ্জারের মতো হাজার হাজার ফিলিস্তিনি এখন ঘরোয়া টোটকা দিয়ে প্রিয়জনদের চিকিৎসা করার চেষ্টা করছেন। ইসরাইলি অবরোধের কারণে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হাত পা কার্যত বাঁধা।

জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বাস্তুচ্যুতদের থাকার জায়গাগুলোর পরিস্থিতি দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে কর্মরত দলগুলো জানিয়েছে যে গাজার মানুষের মধ্যে পোকা-মাকড় এবং চর্মরোগের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। মার্চ মাসে এই সংক্রমণের হার জানুয়ারি মাসের তুলনায় তিন গুণ বেশি ছিল।

তিনি আরো জানান, জানুয়ারিতে যেখানে তিন হাজার মানুষ আক্রান্ত ছিল, মার্চ মাসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজারে। ডুজারিক জরুরি ভিত্তিতে উকুন নাশক শ্যাম্পু, লোশন, পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী এবং কীটনাশক প্রবেশের অনুমতি দেয়ার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন, যেন একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঠেকানো যায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের আরো ক্ষতি থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে স্বাস্থ্যকর্মীরা সংক্রমণ রোধে মরিয়া হয়ে হাজার হাজার তাঁবু জীবাণুমুক্ত করার কাজ করছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের অভাবে অনেক শিবিরই এই সেবার বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

খান ইউনিস পৌরসভার মুখপাত্র সায়েব লাগান বলেন, গত ২৬ দিনে আমরা দুই লাখ তাঁবুর মধ্যে মাত্র ৫০ হাজারটিতে স্প্রে করতে পেরেছি। আমরা প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছি কারণ স্থানীয় বাজারে কোনো কীটনাশক পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় শত শত শিশু খুজলি এবং জলবসন্তে আক্রান্ত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং গাদাগাদি করে থাকার কারণেই মূলত এই রোগ ছড়াচ্ছে।

গাজার সাধারণ চিকিৎসক ডাক্তার সেলিম রমজান এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, চর্মরোগ সাধারণত খুব দ্রুত ছড়ায় কারণ এখানে মানুষ একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকছে। এই মেলামেশা বন্ধ করার কোনো উপায় আমাদের নেই। বর্তমানে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ বাজারে কোনো ওষুধ নেই।

এছাড়া, চিকিৎসার পর রোগীর যে ধরনের পুষ্টিকর খাবার, মুক্ত বাতাস এবং পরিষ্কার পরিবেশে থাকা প্রয়োজন, তার কোনোটিই এখন গাজায় অবশিষ্ট নেই। একদিকে ইসরাইলি অবরোধ আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের উদাসীনতা ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবনকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র : আল জাজিরা