গত এপ্রিলে দক্ষিণ লেবাননে লেবাননি সাংবাদিক আমাল খলিলকে হত্যা এবং তার সহকর্মী জয়নাব ফারাজকে মারাত্মক আহত করার ঘটনাটি স্পষ্টতই এক যুদ্ধাপরাধ।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও লিগ্যাল এজেন্ডা নামক তিনটি আন্তর্জাতিক অধিকার সংস্থার যৌথ তদন্ত রিপোর্টে এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জানায়, বিস্তারিত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইসরাইল জেনেবুঝেই সাধারণ নাগরিক হিসেবে পরিচিত এই দুই সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি ও পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেছে। সেই সাথে এইচআরডব্লিউ বিশ্ববাসীর কাছে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা এবং এসব অপরাধের সাথে জড়িত ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ওপর নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সাধারণ মানুষের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা সরাসরি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল। জাতিসংঘের মানবধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে লেবাননে অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক এবং গাজায় ২১০ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে ইসরাইল।
প্রকাশিত রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন ইসরাইল শুধু হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লেবাননের অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারীদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বহু ঘণ্টা বাধা দিয়ে রেখেছিল। একপর্যায়ে উদ্ধারকাজ চালাতে আসা 'লেবানিজ রেড ক্রস' কর্মীদের ওপর ইসরাইলি ড্রোন থেকে প্রচণ্ড শব্দকারী গ্রেনেড ফেলানো হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো হয়।
এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণেই খলিলের মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ হাসপাতালের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইসরাইলি বিমান হামলায় ভবন ধসে নিচে চাপা পড়ার বহু ঘণ্টা পরও হয়তো জীবিত ছিলেন খলিল।
এইচআরডব্লিউ-এর লেবাননবিষয়ক গবেষক রামজি কাইস বলেন, 'সংগৃহীত প্রমাণাদি অত্যন্ত পরিষ্কার। ইসরাইলি বাহিনী খুব ভালো করেই জানত, অথবা তাদের জানা উচিত ছিল যে খলিল এবং ফারাজ সাধারণ নাগরিক। তা সত্ত্বেও তাদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং পরবর্তীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের বাঁচানোর চিকিৎসাসেবা আটকে রাখা হয়।'
অন্যদিকে বরাবরের মতোই দায় এড়ানোর সুর তুলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, 'সাংবাদিকদের যেকোনো ক্ষতির জন্য তারা অনুতপ্ত।' তারা যুক্তি দিয়েছে, হিজবুল্লাহর দুই সামরিক অপারেটিভকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানের ধারাবাহিকতার মাঝেই এই ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ইসরাইলের দাবি করা প্রথম হামলায় হিজবুল্লাহর দুই সদস্য নিহত হওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের আশ্রয় নেয়া ভবনটিতে দ্বিতীয় হামলা চালানো হয়।
নিহত আমাল খলিল (৪২) লেবাননের জনপ্রিয় দৈনিক 'আল-আখবার'-এ কর্মরত ছিলেন এবং জয়নাব ফারাজ (২১) একজন ফ্রিল্যান্স নারী আলোকচিত্রী ও ক্যামেরাপারসন। গত তিন বছর ধরে চলমান লেবানন যুদ্ধের নানা খবর তারা সাহসের সাথে তুলে ধরছিলেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল এই দুই সাংবাদিক দক্ষিণ লেবাননের 'আল-তীরি' গ্রামে যান। উদ্দেশ্য ছিল, ইসরাইলি বাহিনী আসলেই সেখান থেকে চলে গেছে কি না তা সরেজমিনে যাচাই করা। তারা গাড়ি নিয়ে বিনতে জবেইল শহরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলী নাবিল বাজ্জি এবং মেয়রের বন্ধু মোহাম্মদ হুরানির গাড়ির ঠিক পেছনেই ছিলেন।
আল-তীরি গ্রামটি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দখল করা এলাকার অধীনে ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী এলাকাটিকে সামরিক অঞ্চল দাবি করে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করা সামরিক বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক।
সেদিন দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে আল-তীরি গ্রামে প্রবেশ করতেই বাজ্জি ও হুরানির গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইল। হামলায় ঘটনাস্থলেই ওই দুই পুরুষ নিহত হন। ঘটনা দেখে সাংবাদিক আমাল খলিল তাৎক্ষণিকভাবে লেবাননের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলকে ফোন করে সাহায্যের আবেদন জানান।
উদ্ধারকারী দল দ্রুত গ্রামের প্রবেশদ্বারে গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু সুরক্ষার নিশ্চিত অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তাদের ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হয়। দক্ষিণ লেবাননের যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে কাজ করার জন্য তাদের ডি-কনফ্লিকশন চ্যানেল বা সমোঝোতা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, যেখানে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে।
বিকেল ৫টা বেজে গেলেও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ওই এলাকায় প্রবেশের পথ নির্ধারণ করে দিলেও ইসরাইল প্রবেশের কোনো অনুমতি দেয়নি।
উদ্ধারকারীদের জন্য অপেক্ষা করার সময় খলিল ও ফারাজ তাদের গাড়ি ছেড়ে একটি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। জয়নাব ফারাজ জানান, তারা যখন নিচে অপেক্ষা করছিলেন, তখন ইসরাইলি ক্ষুদ্র ড্রোন (কোয়াডকপ্টার) একেবারে নিচ দিয়ে তাদের মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকে। তিনি বলেন, 'ড্রোনগুলো চালের ওপর দিয়ে একেবারে কাছে চলে এসেছিল, আমার আর আমালের মুখ থেকে এক মিটারেরও কম দূরত্বে ছিল।'
বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে লেবাননের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলের এক সদস্য খলিলকে ফোন করে জানান যে তারা এখনো অনুমতি পাননি, তাই দ্রুত যেন তারা গাড়ি নিয়ে গ্রাম থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু এর ঠিক নয় মিনিট পর (বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে) সাংবাদিকদের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করে ইসরাইল। এতে দুই নারীই আহত হন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফারাজ বলেন, 'চারপাশ থেকে কাঁচ আর ধ্বংসাবশেষ উড়ে এসে আমাদের গায়ে পড়ে। মনে হচ্ছিল আমার কানের পর্দা ফেটে গেছে। আমালের নাক ও মাথা থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছিল, হাত ও উরুতে স্প্লিন্টারের আঘাত লেগেছিল; সে পা নাড়াতে পারছিল না।'
আহত অবস্থায় দুজন কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে পাশের একটি ভবনে আশ্রয় নেন এবং পরিচিতদের ফোন করে উদ্ধারের আকুতি জানাতে থাকেন। তবে সবাইকে একই কথা বলা হয়, সমোঝোতা ব্যবস্থা বা ইসরাইলি অনুমতির আগে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ লেবাননের বায়সারিয়াহ গ্রামে আমাল খলিলের কফিন জড়িয়ে ধরে বোন জয়নাবের বিলাপ।
বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে ইসরাইল তৃতীয় দফায় হামলা চালায়। এবার সরাসরি সেই ভবনটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয় যেখানে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। চোখের পলকে ভবনটি ধসে পড়ে দুজনেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।
অবশেষে বিকেল ৫টায় লেবানিজ রেড ক্রসকে গ্রামে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে জয়নাব ফারাজকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। ফারাজের খুলি ফেটে গিয়েছিল, ডান পা ও চোখে মারাত্মক আঘাত পান এবং তার একটি হাত প্রায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা আমাল খলিলকে তারা উদ্ধার করতে পারেননি।
ঠিক তখনই উদ্ধারকারীদের ওপরও হামলা চালায় ইসরাইল। তাদের লক্ষ্য করে ড্রোনের মাধ্যমে স্তব্ধকারী গ্রেনেড ছোড়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজের সময় অনবরত গুলির শব্দ শোনা গেছে। এইচআরডব্লিউ অ্যাম্বুলেন্সের ছবি পর্যালোচনা করে ছোট অস্ত্রের গুলির ক্ষতচিহ্ন নিশ্চিত করেছে। ক্রমাগত আক্রমণের মুখে উদ্ধারকারীরা কেবল ফারাজকে নিয়ে সেখান থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
ইসরাইলি বাহিনী অবশেষে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে উদ্ধারকারীদের পুনরায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। রাত ১১টায় আমাল খলিলের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
নিকটস্থ তেবনি হাসপাতালের চিকিৎসক ও ময়নাতদন্তকারী দল তার দেহ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে যে, খলিল আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে মারা যান—অর্থাৎ শেষ হামলার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। সেই দীর্ঘ সময় তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থেকে বাঁচার জন্য লড়াই করছিলেন, কিন্তু ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বাধার কারণে তার জীবন বাঁচানোর সব চেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।
তিনটি সংস্থাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করেছে এবং এটিকে ইসরাইলি বাহিনীর দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির কৌশলের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক হেবা মোরায়েফ বলেন, 'গত তিন বছর ধরে লেবাননে সাংবাদিক ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়ে ইসরাইলি বাহিনী যে বিচারহীনতার সুযোগ পেয়ে আসছে, তারই ফলে তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সরাসরি বেসামরিক মানুষদের ওপর এমন ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়ে যেতে পারছে।' তিনি অবিলম্বে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের জোরালো দাবি জানান।



