হিজবুল্লাহর ড্রোনে আতঙ্কগ্রস্ত ইসরাইলকে সমরাস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

হিজবুল্লাহর ড্রোন মোকাবিলায় ইসরাইলের কাছে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের (৯৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার) অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। মূলত হিজবুল্লাহর ড্রোনের মুখে ইসরাইলি সেনাদের অসহায়ত্ব দেখে যুক্তরাষ্ট্র এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহর ড্রোন শক্তির সামনে ইসরাইলি বাহিনীর অসহায় আত্মসমর্পণ আর একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় রীতিমতো ঘাম ছুটছে ওয়াশিংটনের। হিজবুল্লাহর এই প্রাণঘাতী প্রযুক্তির কাছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি নাকানিচুবানি খাওয়ার পর এখন দখলদারদের রক্ষায় নতুন সমরাস্ত্র দেয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ড্রোন মোকাবিলায় ইসরাইলের কাছে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের (৯৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার) অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। মূলত হিজবুল্লাহর ড্রোনের মুখে ইসরাইলি সেনাদের অসহায়ত্ব দেখে যুক্তরাষ্ট্র এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হিব্রু দৈনিক হারেৎজ তাদের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তেল আবিবকে ১০ হাজার সেট ‘অ্যাডভান্সড প্রিসিশন ওয়েপন সিস্টেম’ বা এপিকেডব্লিউএস (APKWS) সরবরাহ করবে। এই ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, এটি ‘আকাশ থেকে ভূমিতে’ নিক্ষেপযোগ্য সাধারণ মিসাইলকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম এমন অস্ত্রে রূপান্তর করতে পারে। এর প্রধান লক্ষ্যই হলো আকাশপথে আসা ড্রোনগুলোকে মাঝপথে আটকে দেয়া বা ধ্বংস করা।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমটি জানাচ্ছে, এই সিস্টেমে পুরনো ‘হাইড্রা ৭০’ মিসাইলের সাথে লেজার গাইডেড সিস্টেম এবং ছোট ডানা যুক্ত করা হয়, যা ইনফ্রারেড রশ্মির মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। যদিও অতীতে এটি মাটিতে থাকা লক্ষ্যবস্তুর জন্য ব্যবহৃত হতো, তবে গত পাঁচ বছর ধরে একে ড্রোন বা হেলিকপ্টার ধ্বংসের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।

তবে আসল দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। হারেৎজ স্বীকার করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই দামি সিস্টেম দিয়েও হিজবুল্লাহর বিশেষ প্রযুক্তির ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’ বা তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোনগুলো ঠেকানো সম্ভব নয়। এমনকি ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে যে ছোট ছোট ‘কোয়াডকপ্টার’ ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত নাজেহাল হচ্ছে, সেগুলো রুখতেও এই মার্কিন প্রযুক্তি কার্যকর হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইউক্রেনকে এই সিস্টেম দিয়েছিল রাশিয়ার ড্রোন ঠেকানোর জন্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও তারা এটি ব্যবহার করেছে। তবে হিজবুল্লাহর ড্রোনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অবিশ্বাস্য কম খরচ। যেখানে একটি ‘এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার’ মিসাইল ছুড়তে ৫ লাখ ডলার বা ‘এআইএম-১২০ আমরাম’ মিসাইলে ১০ লাখ ডলার খরচ হয়, সেখানে এই নতুন গাইডেড অস্ত্রের খরচ মাত্র ৩০ হাজার ডলার। এমনকি ইসরাইলের নিজস্ব আয়রন ডোম মিসাইলের চেয়েও এটি সস্তা।

হিজবুল্লাহর এই ড্রোনগুলো কেন এতো ভয়ংকর, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হারেৎজ বলছে, এগুলো খুব সরু আর সূক্ষ্ম ফাইবার অপটিক তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে কোনো ধরনের জ্যামিং বা সিগন্যাল বাধা দিয়ে একে পথভ্রষ্ট করা যায় না। গত কয়েক সপ্তাহে ইসরাইলি কোম্পানিগুলো হিজবুল্লাহর এই ড্রোন ঠেকানোর অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও এই ড্রোনের আঘাতে দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরাইলি সেনা নিহত এবং উত্তর ইসরাইলে ১২ জন আহত হয়েছে। হিজবুল্লাহ গত মার্চ মাস থেকে এই বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে, যা এখন দখলদার বাহিনীর জন্য যমদূতে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরাইল যখন বারবার লেবাননে বোমাবর্ষণ করে চুক্তি লঙ্ঘন করছে, তখন হিজবুল্লাহর এই সস্তা কিন্তু মারণঘাতী ড্রোনের আঘাতে ইসরাইলি সেনাদের মৃত্যুর মিছিল দখলদারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করেছে। ইসরাইলি টিভি চ্যানেল থার্টিন জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ড্রোনের কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে চরম হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।

ইসরাইলি সামরিক বিশ্লেষক অর হেলার জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর এই সহজ প্রযুক্তি গত এক সপ্তাহে ৩ জন ইসরাইলিকে হত্যা এবং ২০ জনের বেশি সেনাকে আহত করেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইসরাইলি কর্মকর্তারা এখন বলছেন শুধু প্রতিরক্ষা দিয়ে কাজ হবে না, হিজবুল্লাহর এই ড্রোন থামাতে হলে লিটানি নদীর ২০ কিলোমিটার ওপার পর্যন্ত গিয়ে হামলা চালাতে হবে।

সূত্র: তাসনিম নিউজ