ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মার্কিন ও ইসরাইল সমর্থিত একটি বিতর্কিত গোষ্ঠীর নতুন ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ভিড় জমিয়েছেন। কেন্দ্রটি কাজ শুরু করার একদিনের মাথায় এমন ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (২৮ মে) বিবিসি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ভিডিওতে দেখা গেছে, রাফাহ শহরের গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) কম্পাউন্ডে মানুষজন কাঁটাতারের বেড়া ও মাটির বাঁধ ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
জিএইচএফ জানিয়েছে, ত্রাণ প্রত্যাশীদের তুলনায় বিতরণ কর্মীদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় তাদের দলকে একপর্যায়ে পিছু হটতে হয়।
এদিকে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করেছে, ভিড় সামলাতে তাদেরকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘকে পাশ কাটিয়ে জিএইচএফ নামক এ ত্রাণ বিতরণ সংস্থাটি সশস্ত্র মার্কিন নিরাপত্তা কর্মী (ঠিকাদার) ব্যবহার করে গাজায় ত্রাণ সরবরাহের চেষ্টা করছে।
গাজায় ওই ত্রাণ বিতরণের ভিডিওগুলোকে হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করে জাতিসঙ্ঘ বলেছে, তারা ইতোমধ্যে ২১ লাখ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহের একটি পরিকল্পনাও তৈরি করে রেখেছে।
জাতিসঙ্ঘসহ অন্যান্য খাদ্যসংস্থাও জিএইচএফের এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা বলছে, এ উদ্যোগ মানবিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে এবং ত্রাণকে রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়াও এ ত্রাণ কার্যক্রম শারীরিকভাবে দুর্বলদের পিছে ঠেলে দেবে, মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে, বিপদের মুখে ফেলবে এবং বৈশ্বিকভাবে ত্রাণ বিতরণের জন্য একটি খারাপ নজির তৈরি করবে।
ইসরাইল অবশ্য বলছে, হামাস যাতে ত্রাণ চুরি না করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে ইসরাইলের অভিযোগ অস্বীকার করেছে হামাস।
এর আগে, সোমবার জিএইচএফ ঘোষণা দেয়, তারা গাজায় কার্যক্রম শুরু করেছে এবং বিতরণ কেন্দ্রগুলো থেকে ফিলিস্তিনিদের ত্রাণ দিচ্ছে।
মঙ্গলবার বিকেলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, রাফাহর তাল আল-সুলতান এলাকা ও মোরাগ করিডোরে দুইটি বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাদ্য বিতরণ শুরু হয়েছে। কিন্তু ত্রাণ বিতরণের এক ঘণ্টা পরই দেখা যায়, হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুরা কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়েছে। এক ভিডিওতে লোকজনকে দৌড়াতে ও নিচু হয়ে পড়ে যেতে দেখা যায়, পেছনে গুলির শব্দ শোনা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মানুষ বিতরণ এলাকা থেকে খাদ্য ও অন্যান্য ত্রাণ লুটপাট করে নিচ্ছিল। তাদের ভাষ্যমতে, আশপাশে অবস্থান নেয়া ইসরাইলি সেনারাও গুলি ছুড়েছে।
বিবিসি আরবিকে সেখানকার এক ব্যক্তি বলেন, ‘অবস্থা খুবই কঠিন ছিল। প্রতি দফায় মাত্র ৫০ জনকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছিল। শেষে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তখন মানুষ গেট টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে, অন্যদের মারধর করে এবং সব ত্রাণ নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘এটা ছিল এক লজ্জাজনক অভিজ্ঞতা। আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছি। এক কাপ চা খাওয়ার জন্য একটু চিনি আর একটা রুটি চাচ্ছি মাত্র।’
সেখানকার একজন নারী বলেন, ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মানুষকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মানুষ এতটাই ক্লান্ত যে শুধু সন্তানদের খাওয়াতে তারা জীবন ঝুঁকিতে ফেলতেও প্রস্তুত।’
জিএইচএফ জানিয়েছে, তারা স্থানীয় এনজিওর সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত আট হাজার খাদ্যের প্যাকেট বিতরণ করেছে, যা দিয়ে প্রায় চার লাখ ৬২ হাজার মানুষ খেতে পারবে। তবে সংস্থাটি তাদের এ কার্যক্রমে বাধা দেয়ার অভিযোগ করেছে হামাসের বিরুদ্ধে। যদিও তারা এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ ও মধ্য গাজায় চারটি বিতরণ কেন্দ্র খুলবে। সেখানে ফিলিস্তিনিরা খাদ্য ও অন্যান্য ত্রাণ সংগ্রহ করতে পারবে। তারা জানিয়েছে, এ সপ্তাহের শেষ নাগাদ তারা ১০ লাখ মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিতে চায়।
তবে গাজায় হামাস পরিচালিত মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইসরাইলের ত্রাণ বিতরণ উদ্যোগ ‘ব্যর্থ হয়েছে’।
মার্কিন নিরাপত্তা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে পাহারা দেবে ইসরাইলি সেনারা। ফিলিস্তিনিদের সেখানে প্রবেশের আগে পরিচয় যাচাই ও হামাস সম্পৃক্ততা যাচাই করা হবে।
তবে জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য ত্রাণ সংস্থাগুলো বলেছে, তারা এমন কোনো পরিকল্পনায় অংশ নেবে না- যা মানবতা, স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার মৌলিক নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করে।



