ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রীর দফতরে রাতে ড্রোন হামলার ঘটনায় তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে ইরাক সরকার। অন্যদিকে ইরান বলেছে, দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে।
কুর্দিস্তান অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ এর আগে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছিল। তাদের দাবি, স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলের গোয়েন্দা প্রধানের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়েছে এবং দু‘টি ড্রোন ইরানের ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কুর্দিস্তান অঞ্চলটি এক হাজারের বেশি হামলার শিকার হয়েছে। অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনা, বিভিন্ন দেশের তেল কোম্পানি এবং ইরান থেকে নির্বাসিত কুর্দি বিদ্রোহীদের উপস্থিতি রয়েছে। ইরান ও ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এসব হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুর্দিস্তানের রাজধানী এরবিলের আকাশে এর আগেও বেশ কয়েকবার ড্রোন আটকে দেয়া হয়েছে। আবার কিছু ড্রোন কুর্দি বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ও মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানির দফতরে হামলার উৎস এবং ড্রোনগুলো কোথা থেকে উড়ানো হয়েছিল তা শনাক্ত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএকে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরাগচি জানান, বারজানির দফতরে এমন বেপরোয়া হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে সাজানো বা ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ হামলার ব্যাপারে কুর্দি বন্ধুদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ইরাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত টম ব্যারাক হামলার নিন্দা করে বলেন, বারজানি একজন বন্ধু এবং গুরুত্বপূর্ণ কুর্দি অংশীদার। তার ওপর হামলা ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, ইরাকের পূর্ব কুর্দিস্তানের একটি পেট্রোলিয়াম পণ্য সংরক্ষণাগারে বিস্ফোরণে ১৮ জন আহত হয়েছেন বলে কুর্দি সংবাদমাধ্যম রুদাও জানিয়েছে। তবে বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সুলাইমানিয়াহ প্রদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক হিরশ সালিম রুদাওকে জানিয়েছেন, এ ঘটনায় কেউ নিহত হননি।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইরাক সরকার দেশটির ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অস্ত্র সমর্পণের সময়সীমা দিয়েছে।
ইরাকে ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব বেড়েছে।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের পর এসব গোষ্ঠীর অনেকগুলোর উত্থান ঘটে। পরে ২০১৪ সাল থেকে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তারা আরো শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরেই এসব গোষ্ঠী ইরাকে থাকা মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তারা প্রায়ই মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা ঘাঁটিতে হামলাও চালিয়ে আসছে।
কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র হস্তান্তরে সহযোগিতা করার ঘোষণা দিলেও অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা করতেই রাজি নয়।
কুর্দিস্তান কর্তৃপক্ষ এর আগে সোমবার জানিয়েছিল, দু’টি ইরানি ড্রোন বারজানির দফতর এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গোয়েন্দা প্রধানের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে।
বারজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, কুর্দিস্তান কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটের তদন্তে জানা গেছে, দিনের শুরুতে তার ব্যক্তিগত দফতর এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের বাড়িতে ইরানি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ এবং কুর্দিস্তান অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি।
আঞ্চলিক কাউন্টার-টেররিজম অধিদফতর জানিয়েছে, হামলায় কেউ হতাহত হননি।
অধিদফতরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরক বহনকারী হাদিদ-১১০ মডেলের দু’টি ড্রোন ইরান সীমান্তের ওপার থেকে কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দফতর এবং পারাস্তিন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের বাসভবনের দিকে পাঠানো হয়েছিল।
ইরানের অভিযোগ, নির্বাসিত কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা দেশ ও ইসরাইলের স্বার্থে কাজ করছে। এপ্রিল মাসে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইরান এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যায়। পরে ওই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কুর্দিস্তানে থাকা এসব গোষ্ঠী তাদের বেশিভাগ ঘাঁটি ও শিবির সরিয়ে নিয়েছে।
সূত্র: বাসস



