ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর স্ট্রাইক গ্রুপ পশ্চিম ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় প্রবেশ করেছে। এতে রণতরীটি ইরানের ওপর দ্রুত আঘাত হানার সক্ষম অবস্থানে চলে এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও সিএনএনকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এই বহরে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত একাধিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারও রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া তথ্যে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, হোয়াইট হাউস নির্দেশ দিলে এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই এই রণতরী থেকে অভিযান চালানো সম্ভব। সিএনএন জানায়, নতুন অবস্থানের ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যেকোনো মার্কিন অভিযানে দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন।
এই সামরিক সমাবেশ এমন এক সময় ঘটছে, যখন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে—১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের নেতৃত্ব সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের উদ্ধৃত সূত্রগুলো বলছে, যদিও এই মূল্যায়ন ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবু প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হামলার সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় এক ডজন অতিরিক্ত এফ–১৫ই যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাব্য প্রতিশোধ মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনী রক্ষায় অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত দীর্ঘপাল্লার বোমারু বিমানগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইরানে বিক্ষোভ দমনের ঘটনার পর ট্রাম্প সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিকল্প চাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পেন্টাগন সতর্কতার মাত্রা বাড়ায়।
জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এসব মোতায়েনকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দিকে একটি “বৃহৎ নৌবহর” পাঠানো হচ্ছে, তবে তিনি চান না তা ব্যবহার করতে হোক।
রয়টার্সের উদ্ধৃতিতে ট্রাম্প বলেন, “আমরা অনেক জাহাজ ওই দিকে পাঠাচ্ছি, শুধু সতর্কতার জন্য। আমি চাই না কিছু ঘটুক, কিন্তু আমরা তাদের খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি।”
মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ জোরদার
এদিকে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ জোরদার করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সিরিয়া, ইরাক ও ইসরায়েল সফর করে মার্কিন কমান্ডার ও অংশীদার বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
একই সঙ্গে কূটনৈতিক দরজাও খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, তেহরান যোগাযোগ করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র “আলোচনার জন্য প্রস্তুত”।
অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে বার্তা আদান–প্রদান হচ্ছে। যদিও ইরান বলেছে, এ জন্য কোনো স্থায়ী যোগাযোগ চ্যানেল নেই।
কঠোর অবস্থানে তেহরান
ইরানি কর্মকর্তারা কড়া অবস্থানই বজায় রেখেছেন। দেশটির পার্লামেন্টের উপস্পিকার হামিদরেজা হাজিবাবাই সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান “নির্ণায়ক জবাব” দেবে। ইরান সরকারও জানিয়েছে, সম্ভাব্য যেকোনো হামলা মোকাবিলায় তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ভেঙে দেওয়া জরুরি। তিনি হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের কথা উল্লেখ করেন।
ইসরায়েল সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে। এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত স্পষ্ট করে বলেছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো “শত্রুতামূলক সামরিক কর্মকাণ্ডে” নিজেদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি।



