ইহুদিবাদী ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য সময়টা বেশ কঠিন যাচ্ছে। গত আড়াই বছর ধরে তিনি বারবার ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’-এর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখন ঠিক উল্টা। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এখন নিউইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকাও বলছে, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক দীর্ঘ যুদ্ধে টেনে এনেছেন নেতানিয়াহু।
এ বিষয়ে জাফায় বসবাসরত রাজনৈতিক কর্মী আবেদ আবু শাহাদাহর জানান, একদিকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইসরাইল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সাথে সংঘাতে তেল আবিব চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ইসরাইল ভেবেছিল হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু প্রতিরোধ গোষ্ঠীটি আবারো প্রমাণ করেছে যে তাদের সক্ষমতা আগের মতোই অটুট। উত্তর ইসরাইলের শহরগুলোতে টানা হামলা চালিয়ে এবং লেবাননের ভেতরে ইসরাইলি বাহিনীর অগ্রযাত্রা আটকে দিয়ে তারা ইসরাইলের সমস্ত হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে।
আবেদ আবু শাহাদাহ ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাফা-তেল আবিব সিটি কাউন্সিলে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের সাবেক প্রতিনিধি।
১৯৮২ সালে লেবানন আক্রমণের সময় ইসরাইলি বাহিনী মাত্র এক সপ্তাহে বৈরুতে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে লিটানি নদী পর্যন্ত পৌঁছাতেই তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পরও তারা সীমান্ত থেকে মাত্র আট কিলোমিটারের বেশি এগোতে পারেনি।
ইসরাইলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ধ্বংস করে দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সেনাবাহিনী নিজেই এখন ফাঁদে আটকা পড়েছে।
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, হিজবুল্লাহ কোনো বিচ্ছিন্ন গেরিলা দল নয়, বরং তাদের সুসংগঠিত কমান্ড সেন্টার আছে এবং তারা সরাসরি ইরানের সাথে সমন্বয় করে হামলা চালাচ্ছে।
নেতানিয়াহুর এই ব্যর্থতা এখন আর লুকানোর উপায় নেই। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হলে পুরো লেবানন দখল করতে হবে এবং এই যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে পারে।
বর্তমানে ইসরাইলে রিজার্ভ সেনা সদস্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধে তারা ক্লান্ত। যুদ্ধের খরচ চালাতে গিয়ে ইসরাইলি অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের সামরিক বাজেট দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এ কারণেই নেতানিয়াহু এখন লেবানন সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন, যা তিনি আগে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
ইসরাইলের ভেতরে এখন দু’ধরনের সুর শোনা যাচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে লিটানি নদী পর্যন্ত লেবানন দখলের পক্ষে কথা বলছেন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সরাসরি দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি স্থাপনের দাবি তুলছেন।
ইসরাইল এখন লেবাননকে একটি অনুগত রাষ্ট্র বানাতে চায় যাতে সেখানে ইরানের প্রভাব কমানো যায় এবং ফরাসি আধিপত্য খর্ব করা যায়। এমনকি লেবাননের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দিয়ে নিজেদের ফায়দা লোটার নীল নকশাও তৈরি করছে ইসরাইল।
ইসরাইলের আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও ভূগোল আর জনতত্ত্বের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছে, কারণ আন্তর্জাতিক চাপ সামলানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইল যে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বা অখণ্ড ইসরাইলের স্বপ্ন দেখছে, তা কেবল তখনই সম্ভব ছিল যদি আরবরা প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করত। কিন্তু হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ প্রমাণ করে দিয়েছে, শুধু বোমা ফেলে কোনো যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়।
সূত্র : মিড ইস্ট আই



