মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টানা পাঁচ মাসের সামরিক সঙ্ঘাত, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সঙ্কট সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। যদিও দেশটির কোটি কোটি মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আয় সঙ্কটে কঠিন জীবনযাপন করছেন, তবুও অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো এখনো সচল রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক হলেও কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। কৃষি, উৎপাদন ও সেবাখাতের পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বিকল্প উপায়ে তেল রপ্তানি অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে এই টিকে থাকার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে অধিকাংশ পরিবার।
মূল্যস্ফীতির চাপে জনজীবন
কল্যাণ অর্থনীতিবিদ হাদি কাহালজাদেহের মতে, অর্থনীতির পতন বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন রাষ্ট্র কর্মচারীদের বেতন দিতে বা মৌলিক সেবা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। সে অর্থে ইরানের অর্থনীতি এখনো ধসে পড়েনি।
তিনি বলেন, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার সম্মিলিত প্রভাব অত্যন্ত কষ্টকর হলেও তা এখনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অকার্যকর করে দেয়নি।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত এক বছরে মাংস, ডিম, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মূল্য ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও ক্রমাগত বেড়েছে।
কাহালজাদেহ বলেন, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে সরকার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিকে কার্যত মেনে নিয়েছে। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ থাকলেও সেগুলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
তার ভাষায়, "এভাবে অর্থনীতি সচল থাকে, কিন্তু এর পুরো চাপ গিয়ে পড়ে পরিবারগুলোর ওপর।"
ভর্তুকি দিয়ে সঙ্কট সামাল
বর্তমানে ইরানে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১০০ মার্কিন ডলারেরও কম। সরকার খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য নগদ সহায়তা ও ইলেকট্রনিক কুপন চালু রেখেছে।
সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সাইবার হামলার কারণে কয়েকটি বড় ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কুপন প্রকল্পের অর্থ বিতরণেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ১২টি সেতু, দুটি টানেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও সরকার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েছে।
দুর্নীতি বড় অভ্যন্তরীণ সঙ্কট
জার্মানির ফিলিপস ইউনিভার্সিটি মারবুর্গের মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান মনে করেন, ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সমস্যা হলো ব্যাপক দুর্নীতি।
তার মতে, তেলের আয় দীর্ঘদিন ধরে সরকারের দুর্বলতা আড়াল করেছে। কিন্তু একই সাথে এটি রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষতা এবং রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতিকে উৎসাহিত করেছে, যার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবারগুলো ব্যয় কমাচ্ছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ স্থগিত করছে এবং শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ দেশত্যাগের কথা ভাবছে। ফলে অর্থনীতি সচল থাকলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরেনি
ইরানের জেনারেল ইন্সপেকশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জাবিহুল্লাহ খোদাইয়ান জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বিদেশে তেল বিক্রির অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ বা আটকে রেখেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০ হাজারের বেশি রপ্তানিকারক প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ইউরো বৈদেশিক আয় দেশে ফেরত আনতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
মধ্যবিত্ত কমছে, বাড়ছে দারিদ্র্য
সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে যেখানে ইরানের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
অর্থনীতিবিদ হাদি কাহালজাদেহ বলেন, ২০১১ সালে মধ্যবিত্ত ছিল জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এখন তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র বা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর প্রভাব হিসেবে বহু পরিবার খাদ্যতালিকা থেকে মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে এবং বাড়িভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
পুনরুদ্ধারে কূটনীতির বিকল্প নেই
বিশ্লেষকদের মতে, চীন, রাশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইরানকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।
অধ্যাপক ফারজানেগানের ভাষায়, কেবল অভ্যন্তরীণ সংস্কার দিয়ে ইরানের অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথেই অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তার মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশ ছাড়া অর্থনীতির প্রকৃত পুনরুদ্ধার অত্যন্ত কঠিন।
সূত্র : আল জাজিরা



