ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরাইলের আরো নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পশ্চিম তীরের স্থিতিশীলতা এনে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। এটি ইসরাইলের নিরাপত্তার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ‘ইসরাইলের অধিকৃত পশ্চিম তীর সংযুক্তকরণের বিরোধিতা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইইউ, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে। ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা।’
স্থানীয় সময় সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ‘পশ্চিম তীরে স্থিতিশীলতা থাকলে তা ইসরাইলের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প প্রশাসনের যে লক্ষ্য, তার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করার এক দিন পর হোয়াইট হাউস থেকে এই মন্তব্য এসেছে।
ইসরাইলের এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে নতুন বসতি স্থাপনের জন্য ইসরাইলিদের ভূমি অধিগ্রহণ সহজ করা, যা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
সোমবার ৮টি মুসলিমপ্রধান দেশ এক বিবৃতিতে ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, ইসরাইলের এসব অবৈধ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেআইনি ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশে নেয়া হয়েছে। মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ওই যৌথ বিবৃতি দিয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ইসারইলের অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রমকে পাকাপোক্ত করা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেয়া। এতে করে ইসরাইলের অবৈধ দখল বাড়বে।
জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ যুক্তরাজ্য ও স্পেনও এই নিন্দায় যোগ দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানান, গুতেরেস ইসরাইলের এসব পদক্ষেপকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে আল জাজিরার সাংবাদিক গাব্রিয়েল এলিসোন্দো দুজারিককে প্রশ্ন করেন, গুতেরেস কি এসব ব্যবস্থাকে পশ্চিম তীরের ‘ডি ফ্যাক্টো সংযুক্তিকরণ’ হিসেবে দেখছেন কি না। উত্তরে দুজারিক বলেন, এই সিদ্ধান্তগুলো আমাদের সঠিক পথে নিয়ে যাচ্ছে না। তারা আমাদের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থেকে আরো দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
মহাসচিবের মুখপাত্রকে এই সাংবাদিক আরো জিজ্ঞাসা করেন, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব কিভাবে ইসরাইলকে নিরুৎসাহিত করতে পারেন। জবাবে দুজারিক বলেন, আমি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রক্ষার পক্ষে কথা বলে যাব। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য চাপ অব্যাহত রাখব। তবে আমি একা তা করতে পারব না। আমরা চাই অন্যরাও এগিয়ে আসুক।
এরপর সোমবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য সরকার ইসরাইলকে তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের বিষয়ে ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার গতকালের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্য দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানাচ্ছে। ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক কাঠামো একতরফাভাবে পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে।
বিতর্কিত ইসরাইলি পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরের সবচেয়ে বড় শহর হেবরনে ভবন নির্মাণের অনুমতির ক্ষমতা সেখানকার কর্তৃপক্ষ থেকে ইসরাইলের কাছে হস্তান্তর করা।
এই পদক্ষেপগুলো অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত দুটি প্রধান ধর্মীয় স্থান, বেথলেহেমের কাছে র্যাচেলের সমাধি এবং হেবরনে প্যাট্রিয়ার্কদের গুহার ওপর ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করবে।
ইসরাইলের মন্ত্রী স্মোত্রিচ গেল রোববার বলেন, এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো ইসরাইল ভূমির সমস্ত অঞ্চলে আমাদের শিকড় গভীর করা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে সমাহিত করা।
সোমবার রাতে স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইসরাইলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং গাজায় আরো সহিংসতা শুরু করার হুমকি দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই পদক্ষেপগুলো এবং সংযুক্তিকরণের যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। তা শান্তি পরিকল্পনা ও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
স্পেন সরকার চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ইসরাইলকে দখলদার শক্তি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলে, বসতি সম্প্রসারণের কার্যক্রমের অবসান ঘটাতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত আরেকটি ভুল পদক্ষেপ।
সূত্র : ইউএনবি



