ধ্বংস্তূপ থেকে উদ্ধার করা ১১২ লাশকে আজ গাজা সিটিতে গণদাফন করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে এক হাজার দিনের নিঃশব্দ অপেক্ষা শেষে অবরুদ্ধ গাজা সিটিতে মঙ্গলবার আবারো ফিরে এলো সেই রক্তাক্ত দিনের বিভীষিকা। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা একই বংশের ১১২ জনের গলিত দেহাবশেষ দাফন করেছেন তাদের স্বজনরা।
মিডলইস্ট আই মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) উল্লেখ করেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরাইলি বিমান হামলায় এরা প্রাণ হারিয়েছিলেন।
অধিকৃত ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে মঙ্গলবার ফিলিস্তিনের পতাকায় জড়ানো লাশের সারির সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানান আবু শারিয়া এবং আল-হাসায়না পরিবারের সদস্যরা।
স্বজনহারা আমের আবু শারিয়া বলেন, 'এক সাথে কষ্ট আর স্বস্তি কাজ করছে। তিন বছর পর এই শহীদদের দাফন করে শেষ সম্মানটুকু দিতে পারছি, এটা স্বস্তির। কিন্তু কষ্টটাও আবার সেই প্রথম দিনের মতো তাজা হয়ে উঠেছে।'
সাবরা এলাকার সেই হত্যাযজ্ঞ
সাবরা এলাকায় চালানো সেই হামলাটি ছিল গাজার গণহত্যার অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো পুরো একটা আবাসিক এলাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন দুটি পরিবারের কয়েক শত মানুষ। মারা যান ৪৪টি শিশু, ৩৭ জন নারী এবং ১০ জনের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষসহ তিন শতাধিক ফিলিস্তিনি।
ভারী সরঞ্জামের অভাবে তখন লাশও উদ্ধার করা যায়নি, কারণ উদ্ধার সরঞ্জাম ইসরাইল ধ্বংস করেছিল এবং নতুন যন্ত্রপাতি ঢুকতে দেয়নি।

অবশেষে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ছাড়াই গত ১৪ জুলাই থেকে উদ্ধারকাজ শুরু করে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বা সিভিল ডিফেন্স। বোমার বিকট বিস্ফোরণে শরীরের অবশিষ্টাংশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে তারা ১৭ দিন ধরে কাজ করে ১১২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করতে পেরেছেন। এখনও হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে জানান তিনি।
পুরোনো ক্ষত আবারো তাজা
নিহতদের মধ্যে পরিবারের প্রবীণ মুরুব্বি (মুখতার) ফাতহি আবু শারিয়াও ছিলেন। তার বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন সাবেক গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রী মুফিদ আল-হাসায়নার বাড়িতে। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মন্ত্রী থাকা মুফিদ ছিলেন মার্কিন নাগরিক।
বেঁচে যাওয়া মাহমুদ আল-হাসায়না জানান, প্রায় ২০০ জন মানুষ ভেবেছিলেন সাবেক মন্ত্রীর বাড়ি হওয়ায় সেখানে হামলা হবে না। কিন্তু ইসরাইল কোনো নিয়ম-নীতির ধারধারেনি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের তোয়াক্কা করেনি। রোমানিয়া, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনিরাও সেই হামলায় প্রাণ হারান। মাহমুদের ছেলে আহত হয়ে বেঁচে গেলেও তিনি ভাই, বোন ও তাদের পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন।
উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রবাসে থাকা স্বজনরা ফোন করে কেঁদেছেন। এ যেন এক পুরোনো জখম নতুন করে উসকে দেওয়া।
গাজার নিখোঁজ বিষয়ক সরকারি কমিটির প্রধান ওমর নোফাল জানান, সরকারি খাতায় ৬ হাজার নিখোঁজের কথা বলা হলেও আসল সংখ্যা ১৫ হাজারের কাছাকাছি। ফিলিস্তিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল, আহত ১৭০ হাজারের বেশি। এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে পড়ে আছেন গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে।



