ইসরাইলের গাজা দখলের সিদ্ধান্ত

‘মরতে হলে গাজাতেই মরব’

এই শহরে স্থানীয়রাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরে আসা অন্তত ১০ লাখ ফিলিস্তিনি রয়েছে। তারা এই শহর ছেড়ে যেতে রাজি নয়। অধিকাংশেরই মনোভাষ্য এমন যে মৃত্যু হলে এখানেই হবে। বাঁচতে হলে এই শহরেই বাঁচব।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গাজা উপত্যকা
গাজা উপত্যকা |আল জাজিরা

সম্প্রতি গাজা সিটি দখলের ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এতে নতুন করে আরো বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুতিরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের মাঝে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা।

এই শহরে স্থানীয়রাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরে আসা অন্তত ১০ লাখ ফিলিস্তিনি রয়েছে। তারা এই শহর ছেড়ে যেতে রাজি নয়। অধিকাংশেরই মনোভাষ্য এমন যে মৃত্যু হলে এখানেই হবে। বাঁচতে হলে এই শহরেই বাঁচব।

চলমান যুদ্ধে কমপক্ষে আটবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে আহমদ হিরজের পরিবার। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম, এই যুদ্ধে আমি ১০০ বারের মতো মৃত্যুর মুখে পড়েছি। সেজন্য এখানে থেকে যাওয়াই আমার জন্য ভালো। মরতে হলে এখানেই মরব। এখান থেকে আর কোথাও যাব না।

তিনি আরো বলেন, আমরা এখন নানা দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অনাহার, নির্যাতন ও করুণ পরিস্থিতি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এখন মৃত্যুই আমাদের উত্তম পরিণাম।

কাছাকাছি অনুভূতি প্রকাশ করেছেন আরো অনেকেই। রজব খাদের নামের এক ফিলিস্তিনি বলেন, আমি আর দক্ষিণ গাজার দিকে যাব না। সেখানে কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর সাথে একসঙ্গে রাস্তায় থাকতে পারব না।

তিনি আরো বলেন, আমাদের পরিবার ও প্রিয়জনদের গাজা সিটিতেই থাকা উচিৎ। এখান থেকে ইসরাইলিরা আমাদের দেহ ছাড়া আর কিছুকেই আলাদা করতে পারবে না।

উত্তর-পূর্ব বেইত হানুন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন মাঘজুজা সাদা। তিনি আর অন্য কোথাও যেতে রাজি নন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘উপত্যকার কোথাও এখন নিরপত্তা নেই।’ তিনি আরো বলেন, দক্ষিণাঞ্চল নিরাপদ নয়। গাজা সিটিও নিরাপদ নয়। এমনকি উত্তরাঞ্চলেও নিরাপত্তা নেই। এখন তবে আমাদের কোথায় যাওয়া উচিৎ? আমরা কি তবে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে মরব?

‘আতঙ্কের অবস্থা’

গাজা সিটিতে আল জাজিরার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন হানি মাহমুদ। তিনি বলেন, শুক্রবার ভোর থেকেই সেখানে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ কেউ নিজের অবশিষ্ট জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। তবে জানেন না, কোথায় যাবে না। কিংবা তাদের কোথায় যাওয়া উচিৎ। তবে তারা এখনই শহর ছাড়তে চান না। ইসরাইলি বাহিনী জোর করে তাড়িয়ে দিলে যেন শেষ সম্বলটুকু নিয়ে যেতে পারেন, তারই বন্দোবস্ত করে রাখছেন কেবল।

হানি আরো বলেন, তবে সবার মধ্যেই ভয়, হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, গাজা সিটি এমনই একটি অঞ্চল, যেখানে ইসরাইলি বাহিনী উচ্ছেদ অভিযান চালালে অনেক মানুষই নিহত হবে।

ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়া বলেন, শহরের বাসিন্দারা ক্লান্ত-শ্রান্ত। নানা স্থান থেকে বাস্তুচ্যুত হতে হতে আশাহীন হয়ে গেছে। সেজন্য উচ্ছেদের নতুন অভিযানে বিপদ আরো বাড়বে। এছাড়া হাসপাতাল, পানি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বাসিন্দাদের সেবা দেয়ার মতো কোনো কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই।

আমজাদ আরো বলেন, গাজা সিটিতে হামলা হলে আমাদের এমন বয়স্কদেরও স্থানান্তর করতে হবে, যারা নিজে হাঁটতে পারে না। এমন আহত কিংবা অসুস্থদেরকেও বহন করতে হবে, যারা নিজেরা নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। আমরা তাদের পেছনে ফেলে যেতে পারব না। আবার পরিষেবাও দিতে পারব না।

প্রায় ৯ লাখ ফিলিস্তিনি ঝুঁকিতে

ইসরাইলের বিতর্কিত অভিযান বৃদ্ধির খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে, সামরিক বাহিনী দুর্বল জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ভোর থেকে কমপক্ষে ৩৬ জনকে হত্যা করেছে। হাসপাতাল সূত্র অনুসারে, কমপক্ষে ২১ জন সাহায্য চাইছিলেন।

আল জাজিরার সাথে কথা বলা নাসের হাসপাতালের একটি সূত্রের মতে, দিনের হামলার মধ্যে খান ইউনিস শহরের পূর্বে গাজার দক্ষিণ পৌরসভা বানি সুহেলা লক্ষ্য করে একটি ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালানো হয়। যার ফলে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়।

আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, উত্তর গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে এক সাহায্যপ্রার্থী নিহত হয়েছেন। বিতর্কিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল-সমর্থিত জিএইচএফ পরিচালিত একটি সাহায্য বিতরণ স্থানে কমপক্ষে দু’জন নিহত হয়েছেন, যা ইসরাইলের নতুন আক্রমণের আওতায় সম্প্রসারণের জন্য নির্ধারিত।

জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে রিপোর্ট করে আল জাজিরার হোদা আবদেল-হামিদ বলেছেন, কুখ্যাত ফাউন্ডেশন, যা বর্তমানে চারটি সাহায্য কেন্দ্র পরিচালনা করে যেখানে খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে ১,৩০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, মূলত ইসরাইলি বাহিনীর হাতে, উপত্যকায় আরো ১২টি কেন্দ্র পরিচালনা করবে।

আবদেল-হামিদ বলেছেন, ইসরাইল গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য সঠিক সময়সীমা দেয়নি। তবে গাজার সাথে ইসরাইলের দক্ষিণ সীমান্তে সৈন্য চলাচলসহ একটি স্থল আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, শহর থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক সরিয়ে নিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে ইসরাইলের পরিকল্পনা - যার ফলে তারা উপত্যকার উপর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে, একটি বিকল্প বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করবে যা হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নয় - বছরের পর বছর সময় নিতে পারে।

‘যুদ্ধাপরাধ’

জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বেশ কয়েকটি দেশের ক্রমবর্ধমান বিশ্বব্যাপী নিন্দার মধ্যেও ইসরাইলের প্রধান সামরিক সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনা সম্পর্কে কী বলেছে তা স্পষ্ট নয়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার প্রশাসনকে ইসরাইলের গাজা সিটি পরিকল্পনা সম্পর্কে পূর্ববর্তী বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে হামাস নিরীহ মানুষদের আক্রমণ করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটনের কোটি কোটি ডলার সহায়তা ছাড়া ইসরাইল গাজার সম্পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে না। খুব কম লোকই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজাকে পরিষ্কার করার এবং উপত্যকাটিকে মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরায় পরিণত করার ইচ্ছা ভুলে গেছে।

শুক্রবার হামাস গাজা শহরের জন্য ইসরাইলের পরিকল্পনাকে যুদ্ধাপরাধ বলে অভিহিত করে বলেছে যে এই সিদ্ধান্তে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে দেশটি হঠাৎ করে শেষ দফার যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে কেন সরে এসেছে।

টেলিগ্রামে একটি পৃথক বিবৃতিতে তারা বলেছে যে ফিলিস্তিনিরা যেকোনো দখলদারিত্ব বা আক্রমণাত্মক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করবে। ইসরাইলকে আশ্রয় দেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা জানিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে।

জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইসরাইলের উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য এই সপ্তাহান্তে একটি জরুরি অধিবেশন করবে।

সূত্র : আল জাজিরা