নিরাপত্তা পরিষদে গাজা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো যুক্তরাষ্ট্রের

১৫ সদস্যের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া পরিষদের বাকি ১৪টি দেশ পক্ষে ভোট দিয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র |সংগৃহীত

গাজায় ‘তাৎক্ষণিক, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির’ আহ্বান জানিয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৫ সদস্যের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া পরিষদের বাকি ১৪টি দেশ পক্ষে ভোট দিয়েছে।

বুধবার (৪ জুন) এই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয় বলে ‘দ্য গার্ডিয়ানের’ এক প্রতিবেদনে জানা গেছে।

ওই প্রস্তাবে গাজার পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং গাজায় মানবিক সাহায্য প্রবেশ এবং জাতিসঙ্ঘ এবং মানবিক অংশীদারদের দ্বারা এর নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন বিতরণের ওপর সমস্ত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে তুলে নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

ইসরাইলকে রক্ষা করার জন্য এটি পঞ্চমবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের খসড়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো। বাইডেন প্রশাসনের অধীনে নভেম্বরে ওয়াশিংটন একই ধরনের একটি প্রস্তাব ভেটো দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধবিরতির দাবি হামাস কর্তৃক আটক সকল পণবন্দীর তাৎক্ষণিক ও নিঃশর্ত মুক্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

আলজেরিয়া, ডেনমার্ক, গ্রীস, গায়ানা, পাকিস্তান, পানামা, দক্ষিণ কোরিয়া, সিয়েরা লিওন, স্লোভেনিয়া ও সোমালিয়া এ প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও পক্ষে ভোট দিয়েছে।

জাতিসঙ্ঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফন্ট বলেছেন, ‘আমাদের বেশির ভাগই একই দৃষ্টিভঙ্গিতে একত্রিত হচ্ছে বলে মনে হলেও কাউন্সিলকে তার দায়িত্ব পালন করতে বাধা দেয়া হয়েছে।’

নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটির পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজা নিয়ে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে একটি প্রতিকূল জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন এমন কোনো প্রস্তাবকে সমর্থন করবে না যা ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে মিথ্যা সমতা তৈরি করে অথবা ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারকে অবজ্ঞা করে। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের সাথে থাকবে।’

ইসরাইলও মার্কিন ভেটোকে স্বাগত জানিয়েছে।

ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার এক্সে এক বার্তায় লিখেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই একতরফা প্রস্তাবে ইসরাইলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর জন্য এবং ভেটো দেয়ার জন্য আমি মার্কিন প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই। প্রস্তাবিত প্রস্তাবটি কেবল হামাসকে শক্তিশালী করা এবং পণবন্দী চুক্তি অর্জনের জন্য আমেরিকান প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার জন্য।’

অপরদিকে, যুক্তরাজ্য ওই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত বারবারা উডওয়ার্ড ইসরাইলের নতুন সাহায্য ব্যবস্থাকে ‘অমানবিক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, ইসরাইলের ‘এখনই সাহায্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেয়া উচিত।’

তিনি বলেছেন, ‘গাজায় সামরিক অভিযান সম্প্রসারণ এবং সাহায্য কঠোরভাবে সীমিত করার ইসরাইলি সরকারের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিপরীতমুখী। এবং যুক্তরাজ্য তাদের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে।’

নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা ভেটো দেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে।

জাতিসঙ্ঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ব্যর্থ প্রস্তাবটি ‘এই পরিষদের বিবেকের ওপর কেবল একটি নৈতিক দাগই থাকবে না, বরং রাজনৈতিক প্রয়োগের একটি দুর্ভাগ্যজনক মুহূর্ত, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিধ্বনিত হবে।’

জাতিসঙ্ঘে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেছেন, ‘আজকের ভোটের ফলাফল আবারো প্রকাশ করে যে, গাজায় সংঘাত নিরসনে কাউন্সিলের অক্ষমতার মূল কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার বার বাধা। দীর্ঘ সময় ধরে সাহায্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ও ইসরাইলি সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামক একটি প্রকল্পের অস্থির বাস্তবায়নের পর জাতিসঙ্ঘ এবং সাহায্য সংস্থাগুলো গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করার পর এই প্রস্তাবটি ভোটের জন্য উত্থাপন করা হয়েছিল। রাফায় মানবিক সাহায্য গ্রহণের জন্য জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালানোর ঘটনায় প্রাণ গেছে বিপুল সংখ্যক মানুষের।’

বুধবার জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, ‘গাজার একটি খাদ্যকেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের হত্যা সম্পর্কে আমরা যা জানি বিশ্ব দিনের পর দিন দেখছে, ফিলিস্তিনিদের খাওয়ার চেষ্টা করার সময় গুলি করা, আহত করা বা হত্যা করার ভয়াবহ দৃশ্য।

জিএইচএফ ঘোষণা করেছে বৃহস্পতিবার সকালে গাজায় তাদের বিতরণ কেন্দ্রগুলো দ্বিতীয় দিনের জন্য বন্ধ থাকবে। মঙ্গলবার জিএইচএফ বিতরণ কেন্দ্রে খাবারের জন্য অপেক্ষা করার সময় ইসরাইলি গুলিতে কমপক্ষে ২৭ জন নিহত এবং শত শত আহত হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি উডওয়ার্ড জানিয়েছেন, ‘জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে এই ঘটনাগুলোর অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহি করার আহ্বান জানানো হয়েছে।’

এদিকে, গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি মানবিক সহায়তা প্রবেশ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

সূত্র : বাসস