গাজায় ধ্বংসস্তূপের মাঝে অলৌকিক মাতৃত্ব : এক যুদ্ধবিধ্বস্ত নারীর আশার গল্প

আমি চাই এই শিশু অন্তত যুদ্ধ, অবরোধ আর এই অবিচারের মুখে একটি সুরক্ষা পাক। যেন সে আরেকটি শিকার না হয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মানবিক সেই পরিবার
মানবিক সেই পরিবার |আল জাজিরা

ইসরাইলি আগ্রাসনের বিভীষিকায় বিপর্যস্ত গাজা উপত্যকার এক ধ্বংসস্তূপের মাঝে জন্ম নিয়েছে এক হৃদয়বিদারক মানবিক গল্প। গাজার আল-শিফা হাসপাতালে স্বামী মুহাম্মদ লুলুকে খুঁজতে এসে ৩৮ বছর বয়সী আলা লুলু এক অচেনা শিশুকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরেন। শিশুটির পরিচয়পত্র ছিল না। ছিল না কোনো স্বজন। আলা শিশুটিকে দত্তক নেন এবং তার নাম রাখেন আদহাম।

আল জাজিরা মুবাশ্বেরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি তাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছিলাম যেন সে আমার আত্মার অংশ। আমার ২০ বছরের বিবাহিত জীবনে কোনো সন্তান হয়নি। তাই আমি অনুভব করেছি এই শিশুটি আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া এক উপহার।

শিশুটিকে দত্তক নেয়ার জন্য তিনি আল-শিফা হাসপাতাল প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেন। একটি অস্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি আদহামের দায়িত্ব নিয়েছেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তাদের এক অনন্য জীবন অধ্যায়। যুদ্ধ ও নিপীড়নের কালো মেঘের মাঝেও আদহামের আগমন দম্পতির জীবনে নিয়ে আসে আশার আলো।

তবে এই অলৌকিকতার এখানেই শেষ নয়। প্রায় তিন মাস পরে, আলা অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করতে থাকেন। প্রথমে তিনি ভাবেন এটি যুদ্ধজনিত মানসিক চাপ। কিন্তু পরে এক ফিল্ড ডাক্তারের কাছে গেলে জানতে পারেন, তিনি সাত মাসের গর্ভবতী। খবরটি জানার পর তার স্বামী মুহাম্মদ হতবাক হয়ে যান এবং নিজে চিকিৎসকের কাছে ছুটে যান। চিকিৎসক জানান, আড়াই মাসের মধ্যে তোমার একটি মেয়ে হবে। সেই মেয়ের নাম রাখা হয় সাফা।

এখন আলা লুলুর দুটি সন্তান। একজন আল্লাহর উপহারস্বরূপ আগত আদহাম। অন্যজন ২০ বছর অপেক্ষার পর জন্ম নেয়া মেয়ে সাফা। এ যেন ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও এক নবজীবনের প্রতীক।

তবে এই নতুন জীবনের পথ এতটা সহজ ছিল না। যুদ্ধের বাস্তবতা তাদের আনন্দকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তাঁবু থেকে তাঁবুতে বারবার স্থানান্তরের কারণে আলা ও মুহাম্মদকে প্রতিদিন আদহাম ও সাফার জন্য দুধ, খাবার এবং ওষুধ সংগ্রহে চরম কষ্ট করতে হয়েছে।

মুহাম্মদ লুলু বলেন, কোনো নিরাপদ স্থান নেই, খাবার নেই, ওষুধ নেই। জীবন খুবই কঠোর। আমাদের যা আছে তা আমাদের দুই সন্তানের জন্য যথেষ্ট নয়।

আদহাম একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়ে তারা আরো এক হৃদয়বিদারক সমস্যার মুখে পড়েন। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তার চিকিৎসা করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তার কোনো জাতীয় পরিচয় নম্বর নেই।

মুহাম্মদ বলেন, তারা আমাকে বলেছিল যে তার চিকিৎসা করা যাবে না। কারণ সে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত নয়। আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এটি আমার সন্তান, এমনকি যদি আমার স্ত্রী তাকে জন্ম না দেয়, তবুও তার চিকিৎসার অধিকার আছে।

এরপর থেকে তারা বারবার পুলিশ এবং তদন্ত সংস্থার দফতরে গিয়েছেন আদহামের পরিচয় ও নিবন্ধনের জন্য। কিন্তু সাড়া মেলেনি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাকে জাতীয় নম্বর দেয়া যাবে না। কারণ তার পরিবার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।

এখন পর্যন্ত আদহাম পরিচয়হীন, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। অথচ তার দত্তক পিতা-মাতা তাকে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। মুহাম্মদ লুলু বলেন, আমি চাই এই শিশু অন্তত যুদ্ধ, অবরোধ আর এই অবিচারের মুখে একটি সুরক্ষা পাক। যেন সে আরেকটি শিকার না হয়।

এই গল্প গাজার মানুষের এক নিঃশব্দ লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। যেখানে ধ্বংসের মাঝেও ভালোবাসা জন্ম নিতে পারে, একটি পরিবার গড়ে উঠতে পারে এবং মানবিকতা এখনও বেঁচে থাকতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা মুবাশ্বের