তেল রফতানির পথও বন্ধ হয়ে আসছে, ‘এই নৌপথ নিরাপদ নয়’

ইরান যুদ্ধের প্রায় সপ্তম মাসে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো লক্ষণও নেই। ফলে বিশ্বের জ্বালানি উৎপাদনের কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
লোহিত সাগরে একটি তেলবাহী জাহাজ, আগস্টের ছবি
লোহিত সাগরে একটি তেলবাহী জাহাজ, আগস্টের ছবি |সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলো একে একে সংকুচিত হয়ে আসছে। ইরান-সমর্থিত হাউছি যোদ্ধারা লোহিত সাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়ানোয় পারস্য উপসাগরের তেল রফতানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পথও এখন ঝুঁকিতে। অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নেমে এসেছে অনেক নিচে। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক সৌদি আরবের তেল রফতানিও গত মাসে অন্তত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) জানায়, ইরান যুদ্ধের প্রায় সপ্তম মাসে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো লক্ষণও নেই। ফলে বিশ্বের জ্বালানি উৎপাদনের কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের উপকূলঘেঁষা সমুদ্রপথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল চালু রাখতে পারছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বড় ধরনের এবং ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান। জুলাই ও আগস্টে ওমানের কাছাকাছি এই নৌপথে অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। ‘এই নৌপথ নিরাপদ নয়,’ বলেছেন সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল ভিসে বকম্যান।

সাবেক বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র ও জ্বালানি উপদেষ্টা আমোস হকস্টেইন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন তেলের দাম ও পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ বেশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর দলের হাতে বিকল্প কমে এসেছে। তাঁর ভাষায়, ‘তারা আটকে গেছে।’

এরই মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা যুদ্ধের আগের দামের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে—এক বছর আগের চেয়ে ১ ডলারেরও বেশি। ডিজেলের গড় দামও শুক্রবার গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।

ট্রাম্প এ সপ্তাহে বলেছেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ শেষ হবে না। তবে ভোটের পর গ্যাসের দাম ‘ধপ করে নেমে যাবে’ বলেও দাবি করেছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শেষ করা বা জ্বালানির দাম কমানোর মতো বিকল্প এখন প্রশাসনের হাতে খুব কম। গত মাসে তেহরানকে চাপে ফেলতে নতুন কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও তাতে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়নি।

ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ‘তারা বোমা ফেলতে পারে, অথবা কথা বলতে পারে।’

ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ার দাবি জানিয়ে আসছে।

শুক্রবার ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগর বন্দরনগরী মোকা নিয়ন্ত্রণে নেয় হাউছিরা। সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের মিত্র বাহিনীকে তারা সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এর কয়েক দিন আগে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের হামলায় ৭৩ জন বেসামরিক মানুষ আহত হন এবং জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানা হয়।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ফাওয়াজ এ গেরগেস মোকা নিয়ন্ত্রণকে হাউছি ইরান—দুই পক্ষের জন্যই ‘খেলা বদলে দেয়া’ ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানায়, হরমুজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে আগের দিন একাধিকবার হামলা হয়েছে। ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

হরমুজে জাহাজ চলাচল এখন যুদ্ধের আগের দৈনিক প্রায় ১৩০টির তুলনায় সামান্য। সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড়ে ১৯টি জাহাজ গেছে, আগস্টে ২০টি এবং জুনে সর্বোচ্চ ৩৪টি। বৃহস্পতিবার কেপলার মাত্র ৯টি জাহাজ যাওয়ার তথ্য পেয়েছে।

আর হাউছিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাব আল-মান্দাব দিয়ে গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবের মাত্র দুটি তেলবাহী চালান গেছে। ফলে তেল রপ্তানির পথ যেন একের পর এক বন্ধ হয়ে আসছে।