যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে পুনরায় খুলতে যাচ্ছে ইসরাইল। আজ রোববার থেকে এই সীমান্ত দিয়ে সীমিত পরিসরে শুধু মানুষের যাতায়াতের অনুমতি দেয়া হবে। মানবিক সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির পর এই সিদ্ধান্ত এলো।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সহিংসতা অব্যাহত থাকার মধ্যেই সীমান্ত খোলার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানায়, শনিবার ইসরাইলি হামলায় সেখানে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে হামলা চালিয়েছে।
প্রবেশ ও বহির্গমন পথ- নাগরিকদের চলাচল এবং ত্রাণ প্রবেশের জন্য রাফাহ সীমান্ত গাজার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হামাসের সাথে যুদ্ধ চলাকালে ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি বাহিনী সীমান্তটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকে এটি বন্ধ ছিল। কেবল ২০২৫ সালের শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য সীমিতভাবে এটি খোলা হয়েছিল।এর আগে ইসরাইল জানায়, গাজায় আটক শেষ ইসরাইলি পণবন্দী রন গিভিলির লাশ ফেরত না আসা পর্যন্ত সীমান্ত খোলা হবে না। কয়েক দিন আগে তার লাশ উদ্ধার করা হয় এবং বুধবার ইসরাইলে তাকে সমাহিত করা হয়।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বেসামরিক বিষয়ক সংস্থা সিওজ্যাট শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আগামী রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) উভয় দিকেই সীমিত পরিসরে শুধু মানুষের চলাচলের জন্য রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়া হবে।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, মিসরের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং ইসরাইলের পূর্বানুমোদিত নিরাপত্তা ছাড়পত্রের ভিত্তিতে প্রবেশ ও প্রস্থান অনুমোদিত হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
তবে কতজন মানুষ সীমান্ত পার হতে পারবেন বা গাজায় ফিরতে ইচ্ছুকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে কি না- এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
সীমান্ত এলাকার একটি সূত্র জানায়, রোববারের বেশিভাগ সময়ই যাবে প্রস্তুতি ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায়।
সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানায়, পরীক্ষামূলকভাবে রোববার সীমান্ত খোলা হবে মূলত আহত ব্যক্তিদের যাতায়াতের জন্য। সোমবার থেকে নিয়মিতভাবে সীমান্ত খোলার কথা রয়েছে।
তবে কতজন ফিলিস্তিনি প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সূত্রগুলো জানায়, ইসরাইল যাদের গাজা ছাড়ার অনুমতি দেবে, মিসর তাদের সবাইকে গ্রহণ করার পরিকল্পনা করেছে।
কিডনি রোগে আক্রান্ত ৩৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ শামিয়া বলেন, ‘প্রতিটি দিন আমার জীবনকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, আমার অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে।’ বিদেশে ডায়ালাইসিস চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা শামিয়া বলেন, ‘আমি প্রতিটি মুহূর্ত রাফাহ সীমান্ত খোলার অপেক্ষায় আছি।’
বিদেশে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি পাওয়া ১৮ বছর বয়সী সাফা আল-হাওয়াজরিও একইভাবে অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন পূরণের আশা নিয়ে অপেক্ষা করছি, যা এই সীমান্ত খোলার সাথে জড়িত।’
তিনি আরো বলেন, খুললেই যেন দ্রুত ভ্রমণ করতে পারি, এই আশাই করছি।
গাজার দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত রাফাহই একমাত্র স্থলপথ, যা দিয়ে ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকা দিয়ে না গিয়ে গাজায় প্রবেশ ও প্রস্থান করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী ইসরাইলি বাহিনী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে সরে যাওয়ার পরও এই এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
বর্তমানে গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বাকি অংশ রয়েছে হামাসের কর্তৃত্বে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের পর শর্ত অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি মুক্তিকামীদের হাতে আটক সব ইসরাইলি পণবন্দীদের মুক্তি বা লাশ প্রত্যাবর্তনের পর সীমান্ত পুনরায় খোলার কথা রয়েছে।
রাফাহ সীমান্ত খোলার ফলে ১৫ সদস্যের একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির গাজায় প্রবেশ সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) নামে এই কমিটি গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির জন্য গঠিত হয়েছে।
কমিটিটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাথের নেতৃত্বে থাকা এনসিএজি সীমান্ত খোলার পর গাজায় প্রবেশ করার কথা রয়েছে।
এর মধ্যেই সহিংসতা থামেনি। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানায়, শনিবার ইসরাইলি বিমান হামলায় কয়েক শিশুসহ অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি হামাস কর্তৃপক্ষের অধীনে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, শুক্রবার রাফাহ শহরে একটি সুড়ঙ্গ থেকে আটজন ‘ফিলিস্তিনি যোদ্ধা’ বেরিয়ে আসার ঘটনার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ওই ঘটনা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
সূত্র : বাসস



