যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ আর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবিশ্বাস-সংঘাত নিরসনে বর্তমানে ছায়াসঙ্গীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পাকিস্তান। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে দেশটি।
আল জাজিরার প্রতিনিধি ওসামা বিন জাভেদ দোহা থেকে জানিয়েছেন যে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে গেছেন এবং তারা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ সুগম করার চেষ্টা করছেন। সংঘাতের ৪৮তম দিনে এসে যখন উত্তেজনা চরমে, তখন পাকিস্তানের এই 'শাটল ডিপ্লোম্যাসি' বা দৌড়ঝাঁপ রাজনীতি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন দেশটির সেনাবাহিনী প্রধান। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো দূর করতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়েছেন। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কিছু কট্টরপন্থী পক্ষ। পাশাপাশি তারচেয়েও বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে ইসরাইল।
পাকিস্তানিদের মতে, ইসরাইল এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী কোনো শান্তি চায় না, যা আলোচনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। তবু পাকিস্তান আশা ছাড়ছে না। তারা বিশ্বাস করে, এই গোপন আলোচনার মাধ্যমেই হয়তো দ্বিতীয় দফার কোনো বড় সমঝোতা হবে অথবা অন্তত ৪৫ দিন বা পাঁচ সপ্তাহ মেয়াদী একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
পাকিস্তানের ভাষ্যমতে, কূটনীতি সবসময় বন্ধ দরজার আড়ালে এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই সফল হয়। তারা এখন সেই আস্থার ফাটলটিই মেরামতের চেষ্টা করছে, কারণ প্রকাশ্যে দুই দেশই একে অপরের প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা প্রকাশ করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সংঘাত নিরসনে পাকিস্তান বর্তমানে তেহরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। এই শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল এখন তেহরানে সফর করছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ একটি আঞ্চলিক সফরে বেরিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্কের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো। এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক সময়ে তুঙ্গে উঠেছে যখন ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের জবাবে নিজেদের পানিসীমার বাইরেও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। পরিস্থিতি যখন অগ্নিগর্ভ, তখন পাকিস্তান এই যুদ্ধ থামানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে কাজ করছে।
আঞ্চলিক জোট ও স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা
পাকিস্তানের এই শান্তি মিশনে পাশে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। ন্যাটোর সদস্য এবং ইরানের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে তুরস্ক শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গঠনমূলক আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা চলমান এই যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
তুরস্কের আনাতোলিয়াতে আগামী ১৭-১৯ এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একত্রিত হবেন। কাতারে নিজের সফর শেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেবেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের এই ধারাবাহিক মধ্যস্থতা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
সূত্র : আল জাজিরা।



