ইসরাইল-ভারত সম্পর্ক

গভীরতর হচ্ছে, তেল আবিবের সামরিক শক্তিতে জ্বালানি জোগাচ্ছে দিল্লি

২০১৭ সালে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরাইল সফরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছর ইরান আক্রমণের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও মোদি ইসরাইলে অবস্থান করছিলেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানে ইসরাইল-মার্কিন হামলার আগেভাগে জেরুজালেমে মোদিকে স্বাগত জানান নেতানিয়াহু
ইরানে ইসরাইল-মার্কিন হামলার আগেভাগে জেরুজালেমে মোদিকে স্বাগত জানান নেতানিয়াহু |সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার সাথে সাথে ইসরাইলের সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো গভীর হচ্ছে। নিউজলেটার 'দিস ইজ ইন্ডিয়া'-য় পত্রিকাটির আন্তর্জাতিক বার্তা সম্পাদক ও নিবন্ধকার নিহা মসীহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেই অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে, ফিলিস্তিনের গাজায় চালানো সামরিক অভিযানে ধ্বংসস্তূপ তৈরি হওয়ার এবং ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রধান অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভারত।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) জানিয়েছে,, ভারতের এই পদক্ষেপ দেশের ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, কারণ অতীতে দেশটি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার সমর্থক ছিল এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ এবং দ্য হিন্দু পত্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পাদক স্ট্যানলি জনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, দিল্লি ও তেল আবিবের মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক মাত্রায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গভীর কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপ নিয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে ভারত মূলত ইসরাইলি অস্ত্রের অন্যতম প্রধান ক্রেতা দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ এবং চুক্তিভিত্তিক অস্ত্র উৎপাদনের মাধ্যমে ভারত এখন সরাসরি ইসরাইলের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে 'উল্লেখযোগ্য অবদানকারী' শক্তি হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি বাণিজ্য ও চালান সংক্রান্ত উপাত্ত পর্যালোচনা করে অ্যামনেস্টি প্রমাণ পেয়েছে, ভারতীয় কারখানা থেকে ইসরাইলের প্রধান প্রধান সামরিক সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর কাছে ৩,৯০,৫১৬টি ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ৫,৬৪,৯৭০টি বিস্ফোরক অর্ডন্যান্সের উপাদান এবং ২৯৮টি সামরিক যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাঠানো হয়েছে। এই সরবরাহ নিশ্চিতকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মিউজিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড, ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড এবং অ্যাডভান্সড ওয়েপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেডের মতো তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও রয়েছে। সংস্থাগুলোর এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক গণহত্যায় ভারতকে অংশীদার করার ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

Indina-laboras-in-Israel

২০ হাজারের বেশি ভারতীয় শ্রমিককে ইসরাইলের নির্মাণ ও সেবামূলক খাতে পাঠানো হয়েছে

আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী আইন লঙ্ঘনের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে যুক্তরাজ্যসহ অনেক পশ্চিমা দেশ যখন ইসরাইলে অস্ত্র পাঠাতে বিধিনিষেধ জারি করেছে, তখন ভারত সম্পূর্ণ বিপরীত পথ বেছে নিয়েছে। যদিও জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে যে ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, তবুও ভারতে কোনো শক্ত রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিবাদ দেখা যায়নি। মোদির সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে হিন্দুত্ববাদ ও জায়োনিজম ভাবাদর্শের এক অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে, যারা ইসরাইলকে বিশেষ সামরিক ও জাতীয়তাবাদী মডেল হিসেবে বিবেচনা করে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতানিয়াহুর সাথে কৌশলগত ব্যক্তি সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ২০১৭ সালে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরাইল সফরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছর ইরান আক্রমণের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও মোদি ইসরাইলে অবস্থান করছিলেন। তবে আদালতে সাধারণ নাগরিক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের আবেদন জানালে সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে সরকারের এখতিয়ার বলে রায় দেয়। একইভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব রপ্তানি জাতীয় আইন অনুযায়ী সম্পাদিত হচ্ছে।

শুধু সামরিক সরঞ্জামই নয়, ২০২৩ সালে ফিলিস্তিনি কর্মীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার পর চুক্তির মাধ্যমে ২০ হাজারের বেশি ভারতীয় শ্রমিককে ইসরাইলের নির্মাণ ও সেবামূলক খাতে পাঠানো হয়েছে।