কন্যার প্রথম জন্মদিন ও স্বামীর শাহাদাত বার্ষিকী

গাজায় ফিলিস্তিনি নারীর আনন্দ ও বেদনাময় দিন

আজ সানার প্রথম জন্মদিন। একই দিনে স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী। তাই শোক আর আনন্দের মাঝামাঝি এক অনুভূতি নিয়ে ছোট্ট আয়োজন করেছেন আমাল। স্বামীর ছবির পাশে রাখা হয়েছে একটি কেক।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
কন্যার সাথে ফিলিস্তিনি নারী। পাশে রাখা শহীদ স্বামীর ফটো
কন্যার সাথে ফিলিস্তিনি নারী। পাশে রাখা শহীদ স্বামীর ফটো |আল জাজিরা

আমাল সোবেহর জীবনে ২০২৫ সালের ৭ মে দিনটি হয়ে আছে একসঙ্গে আনন্দ আর শোকের প্রতীক। সেদিনই তার কোলজুড়ে আসে কন্যাসন্তান সানা। কিন্তু জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হন তার স্বামী, গাজার সাংবাদিক ইয়াহইয়া সোবেহ।

আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ নগরী গাজার এক পরিবারের বেদনাময় এই গল্প।

সেদিন ভোরে প্রসববেদনা শুরু হলে ইয়াহইয়া নিজেই স্ত্রী আমালকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চারদিকে যুদ্ধ, ধ্বংস আর মৃত্যুর বিভীষিকা থাকলেও নতুন অতিথিকে ঘিরে ছিল তাদের অফুরন্ত স্বপ্ন। আগে থেকেই তাদের দুই ছেলে সন্তান ছিল— বারা ও কেনান। এবার একটি মেয়ের অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

চিকিৎসকদের পরামর্শে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় ছোট্ট সানা। আমাল বলেন, “সবকিছু সুন্দরভাবেই হয়েছিল। ইয়াহইয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিল। সবাইকে বলছিল— ‘দেখো, আমার রাজকন্যা এসেছে।’”

কয়েক ঘণ্টা স্ত্রী ও নবজাতকের পাশে কাটিয়ে ইয়াহইয়া বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেন। দুই ছেলেকে দেখে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে দ্রুত ফিরে আসবেন বলেও আশ্বাস দেন স্ত্রীকে। কিন্তু সেটিই ছিল তাদের শেষ দেখা।

মেয়ের জন্মের মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পর গাজা সিটির একটি বাণিজ্যিক এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১৭ জনের সাথে নিহত হন ইয়াহইয়া সোবেহ। এর কিছুক্ষণ আগেই তিনি নবজাতক কন্যার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন।

হাসপাতালে থাকা আমাল প্রথমে কিছুই জানতেন না। চারপাশের অস্বাভাবিক নীরবতা, স্বজনদের থমথমে মুখ আর ইয়াহইয়ার ফোন বন্ধ— সবকিছু মিলিয়ে তার মনে অজানা আশঙ্কা জন্ম নেয়।

শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেটে খবর দেখে স্বামীর মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।

আমাল বলেন, “স্ক্রিনে দেখলাম— ‘কন্যাসন্তানের জন্মের পাঁচ ঘণ্টা পর নিহত সাংবাদিক ইয়াহইয়া সোবেহ।’ তখন মনে হয়েছিল পৃথিবীটা আমার ওপর ভেঙে পড়েছে।”

অস্ত্রোপচারের কারণে শেষবারের মতো স্বামীকে ছুঁয়েও দেখতে পারেননি তিনি।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই একের পর এক স্বজন হারিয়েছেন আমাল। ভাই, ভাবি, ভাইপো-ভাইঝি, বোনের সন্তান— অনেকেই ইসরাইলি হামলার শিকার হয়েছেন। তবে ইয়াহইয়ার মৃত্যু তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা হয়ে আছে।

বর্তমানে তিন সন্তানকে নিয়ে বাস্তুচ্যুত জীবনে সংগ্রাম করছেন আমাল। তবু থেমে যাননি। স্বামীর স্মৃতি ধরে রাখতে তিনি এখন ইয়াহইয়ার পুরোনো কর্মস্থলেই কাজ করছেন।

তিনি বলেন, “বাচ্চারা যখন জিজ্ঞেস করে বাবা কোথায়, তখন কোনো উত্তর দিতে পারি না। বাবার অভাব কখনও পূরণ হবে না।”

আজ সানার প্রথম জন্মদিন। একই দিনে স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী। তাই শোক আর আনন্দের মাঝামাঝি এক অনুভূতি নিয়ে ছোট্ট আয়োজন করেছেন আমাল। স্বামীর ছবির পাশে রাখা হয়েছে একটি কেক।

আমাল বলেন, “সানা এখন হাঁটতে শিখছে, কথা বলতে শিখছে। ওর মুখে আমি ইয়াহইয়ার ছায়া দেখি। মেয়ের জন্যই বেঁচে থাকার শক্তি পাই।”

সূত্র : আল জাজিরা