গাজা শহর দখলের জন্য ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে দেশটির নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি। মন্ত্রিসভা যুদ্ধ শেষ করার জন্য পাঁচটি নীতিও গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নয় এমন একটি বিকল্প বেসামরিক সরকার গঠন করা।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, সেনাবাহিনী গাজা শহর নিয়ন্ত্রণে নেবে যেখানে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করেন। নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ ইসরাইলেও বিরোধিতার মুখে পড়েছে। হামাসের হাতে আটক পণবন্দীদের পরিবারগুলোও বলছে, এর ফলে তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।
আরো বেশি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হওয়ার আগে দেশটির সামরিক নেতৃত্ব ও বিরোধী দলও সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছিল, গাজার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষোভের মধ্যে এই পদক্ষেপ ইসরাইলকে আরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলবে।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় গাজা শহর দখলের অনুমোদিত পরিকল্পনা এবং ‘যুদ্ধ শেষ করার জন্য পাঁচটি নীতি’ সম্পর্কে বিস্তারিত একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যা মন্ত্রিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে বেসামরিক জনগণকে মানবিক সহায়তা প্রদানের সময় আইডিএফ গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেবে।’
যুদ্ধ শেষ করার জন্য যে নীতিগুলো নেয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, জীবিত ও মৃত পণবন্দীদের ফেরানো, গাজা উপত্যকার নিরস্ত্রীকরণ, গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নয় এমন একটি বিকল্প বেসামরিক সরকার গঠন।
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের বিষয়ে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা নিয়ে এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসঙ্ঘের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। মঙ্গলবার জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকা বলেন, ‘এটি লাখ লাখ ফিলিস্তিনির জন্য বিপর্যয়কর পরিণতির ঝুঁকি তৈরি করবে এবং গাজার অবশিষ্ট পণবন্দীদের জীবনকে আরো বিপন্ন করতে পারে।’
ইসরাইল ইতোমধ্যেই গাজা উপত্যকার বিশাল অংশের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ রাখার দাবি করে আসছে। জাতিসঙ্ঘের অনুমান, গাজার ৮৭ শতাংশ এলাকাই হয় স্বীকৃত সামরিক নিয়ন্ত্রণে অথবা উচ্ছেদের নোটিশের আওতায় আছে। গত মার্চ মাসে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইসরাইল পুরো উপত্যকাকে ‘বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা করে যা পরবর্তী মাসগুলোতে ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট কিছু এলাকার জন্য উচ্ছেদের নোটিশও জারি করে, যদিও কখন এগুলো প্রত্যাহার করা হয় তা সবসময় স্পষ্ট করা হয় না।
নিজের প্রস্তাবগুলো নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের প্রস্তুতি নেয়ার সময় ফক্স নিউজকে একটি সাক্ষাৎকার দেন নেতানিয়াহু। সেখানে বিস্তারিত কিছু না বললেও ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এছাড়া হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বেসামরিক শাসন অন্য দলের কাছে হস্তান্তর করতে চান বলেও জানান তিনি। তবে তিনি এটাও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অঞ্চলটি ধরে রাখার ইচ্ছা নেই তার।
কী ব্যবস্থাপনা করা হবে বা কোন দেশগুলো এখানে জড়িত থাকতে পারে সে সম্পর্কে অবশ্য বিস্তারিত কিছু বলেননি নেতানিয়াহু। তবুও, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার জন্য তিনি কী কল্পনা করছেন এটি তারই একটি ইঙ্গিত। আপাতত নেতানিয়াহু একটি বিস্তৃত আক্রমণ চালাতে চান যার মাধ্যমে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার কেন্দ্রীয় অংশের শিবিরগুলোতে অভিযান চালাতে পারে, যেখানে প্রায় দশ লাখের মতো ফিলিস্তিনি বসবাস করেন।
বর্তমানে গাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে বলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করে।
সম্ভাব্য এই অভিযান কয়েক মাস ধরে চলতে পারে। এর অর্থ হবে ব্যাপকভাবে মানুষের বাস্তুচ্যুতি। এছাড়া এর মাধ্যমে সেখানে মানবিক পরিস্থিতি আরো খারাপ দিকে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে।
সূত্র : বিবিসি



