ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনকে কেন্দ্র করে আজ শনিবার থেকে কয়েক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি শুরু হয়েছে। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানী তেহরানে শত শত হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে। শোকাহত জনতা বুক চাপড়ে শোক প্রকাশের পাশাপাশি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে এক বিমান হামলায় নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী খামেনি। তার মৃত্যু ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বকে আরো সুসংহত করার সুযোগ এনে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এমন সময়ে এই শোকানুষ্ঠান শুরু হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজের প্রভাবকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। একইসাথে ইসরাইল আবারো হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কাও পুরোপুরি কাটেনি।
অনুষ্ঠানস্থল থেকে ইরানের প্রধান আলোচক কাজেম গারিবাবাদি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে যৌথ টহলের সম্ভাবনা নিয়ে তাদের মন্তব্য উত্তেজনা আরো বাড়াতে পারে।
একই হামলায় নিহত খামেনির পরিবারের সদস্যদের কফিনও তার কফিনের পাশে রাখা হয়। কফিনগুলো দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ ‘আমাদের কথা একটাই—প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দেন। অনেকের হাতে ছিল ব্যানার ও পতাকা।
দাফন অনুষ্ঠান উপলক্ষে তেহরানজুড়ে বিভিন্ন বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে খামেনির প্রতিকৃতি। শিয়া রীতিতে শোক প্রকাশের অংশ হিসেবে অনেক পুরুষকে বুক চাপড়াতেও দেখা গেছে।
মাসুমেহ মোহাম্মাদি নামে এক শোকাহত ব্যক্তি বলেন, ‘ইমাম খামেনি ছিলেন আমাদের হৃদয়, আমাদের পিতা, আমাদের সবকিছু। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না, তাকে শহীদ করা হয়েছে। তার মৃত্যুর প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শেষ শ্রদ্ধা
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নির্মিত মঞ্চটি খামেনির তেহরানের হুসাইনিয়ায় দেয়া ভাষণের মঞ্চের আদলে সাজানো হয়েছে। সেখানে তার ব্যবহৃত চেয়ারের অনুরূপ একটি চেয়ার, মাইক্রোফোন ও পাশে ছোট টেবিল রাখা হয়েছে। মঞ্চের ওপরে টাঙানো হয়েছে ১৯৮৯ সালে মারা যাওয়া ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রতিকৃতি।
১৯৮৯ সালে খোমেনির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হারাল।
গ্রীষ্মের তাপদাহে এদিন স্বেচ্ছাসেবীরা শোকাহত মানুষের ওপর পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। বাইরে খাবার ও পানীয় বিতরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে মেটাল ডিটেক্টর ও তল্লাশির পর নারী-পুরুষকে আলাদা করে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। চারপাশের সড়কে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
খামেনির কফিনের ওপর তার কালো পাগড়ি রাখা হয়েছে, যা তাকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর বংশধর হিসেবে চিহ্নিত করে। নিহতদের মধ্যে মোজতবা খামেনির স্ত্রীও ছিলেন। তবে মোজতবা নিজে দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন কি না, তা স্পষ্ট হয়নি। হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবরিজ থেকে আসা আলী কাজেমি বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি দেশ ও ধর্ম রক্ষায় আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে।’
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসেই শুরু শোকানুষ্ঠান
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ২৫০তম বার্ষিকী ৪ জুলাইকেই শোকানুষ্ঠান শুরুর দিন হিসেবে বেছে নিয়েছে ইরান। যদিও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতা ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘ইসরাইলের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেন।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটায় মাউন্ট রাশমোরের সামনে দেয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানকে কঠিনভাবে আঘাত করেছি। তারা এখন সমঝোতা করতে মরিয়া। তাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য আমরা এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি।’
তেহরানের অনুষ্ঠানে কয়েকজন শোকাহতকে ‘#KillTrump’ লেখা একটি বড় পতাকা বহন করতেও দেখা যায়।
মায়ের সাথে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে ২৭ বছর বয়সী হানানেহ মুসাভি বলেন, ‘আমি আমার প্রিয় নেতা আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছি। এমন একটি দিন দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। এই ট্র্যাজেডির আগে যদি আমার মৃত্যু হতো, সেটাই ভালো হতো।’
এদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর যৌথ বিবৃতির সমালোচনা করে কাজেম গারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব এবং বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের পরিণতির দায় তাদেরই নিতে হবে।
দাফন বৃহস্পতিবার
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খামেনির লাশ ইরানের বিভিন্ন শহর ও প্রতিবেশী দেশ ইরাকে নেয়া হবে। শোকানুষ্ঠান উপলক্ষে বিভিন্ন সড়ক, আকাশপথ এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে।
আগামী বৃহস্পতিবার খামেনিকে তার জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা আ.-এর মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।
রোববার গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সোমবার খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের লাশ তেহরানের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করানো হবে। এতে আরো বড় জনসমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র : এপি/ইউএনবি



