গাজার তীব্র যুদ্ধ, বারবার ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া আর অবর্ণনীয় ক্ষুধার মাঝেও ফিলিস্তিনি মায়েরা নতুন এক জীবনের সুরক্ষায় মরিয়া লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর এই চরম দুর্দশার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নবজাতক শিশুরা। অনাহার আর সুপেয় পানির সংকটে গাজার মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে প্রতিদিন অভূতপূর্ব শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছেন।
আল জাজিরা, বুধবার (১৯ আগস্ট) জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ অঞ্চলে চরম অপুষ্টি ও চিকিৎসাসেবার অভাবে নতুন মা ও সদ্যজাত শিশুদের স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সেখানে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর কাছে শিশুদের দুধ ও পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করা এক অসাধ্য লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। শিশুকে দুধ খাওয়ায় যে ফিলিস্তিনি মায়েরা, তারা কেবল নিজ শরীরের অবশিষ্ট পুষ্টিই নিঃশেষ করছেন না, বরং ক্রমাগত বোমাবর্ষণ আর মৃত্যুর শোক সামলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইও করছেন।
এমনই একজন ৩৮ বছর বয়সি ফিলিস্তিনি মা ইমান হুনাইদিক। তিনি তিন সন্তানের জননী। ডায়াবেটিস ও রক্ত জমাট বাঁধার জটিল রোগে ভুগতে থাকা ইমানের গর্ভাবস্থা কাটে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে। পর্যাপ্ত খাবার ও জরুরি চিকিৎসার অভাবে তার ৯ মাস বয়সি কন্যাশিশু ওয়ার্দ সময়ের আগেই জন্মগ্রহণ করে এবং তাকে একটানা ১০ দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়। ইমান জানান, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অপুষ্টির কারণে তিনি সঠিকভাবে বুকের দুধ পান করাতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তার স্তনে বেদনাদায়ক ক্ষত তৈরি হয়। বিকল্প হিসেবে ফর্মুলা মিল্ক খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও গাজায় এর চড়া দাম আর পরিষ্কার পানির চরম সংকট তার সেই পথও কঠিন করে তোলে। বর্তমানে একটু পরামর্শ ও সহায়তার আশায় তিনি সপ্তাহে দুই দিন ছোট সন্তানকে নিয়ে স্থানীয় হিকর আল-জামে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের 'মা ও শিশু কোণ'-এ ছুটে যান।
দেইর আল-বালাহের সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একজন স্তন্যদান বিশেষজ্ঞ সাবরিন আল-বুহাইসি এই সংকটের করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, 'ক্রমাগত ঘরবাড়ি স্বজন হারানোর বেদনা, চোখের সামনে একের পর এক মৃত্যু এবং চরম অর্থনৈতিক সংকট ফিলিস্তিনি মায়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে দিয়েছে। এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের দুধ খাওয়ানোর প্রক্রিয়ার ওপর। এমনকি এই যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি মা এবং নারীদের মৌলিক স্বাস্থ্য সচেতনতাকেও ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে।' ফিলিস্তিনের এই মায়েরা প্রতিদিন ক্ষুধা ও বোমার সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।



