ওয়াশিংটনের কাগজে হিসাবটা খুবই সহজ ছিল। যুদ্ধ শুরু হবে। এক দুই দিনের মধ্যেই তেহরানের শক্তি ভেঙে পড়বে। ক্ষমতার কেন্দ্র ছত্রভঙ্গ হবে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র তাসের ঘরের মতো ধূলায় ধসে পড়বে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হতেই দেখা যাচ্ছে হিসাবটা মেলেনি। বরং যুদ্ধের ধাক্কা সামলে ইরান দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই। তখনই প্রশ্নটা সামনে এসে দাঁড়ায়। আসলে ভুল হিসাবটা কে করেছিল। পেন্টাগনের করিডরে হয়তো বাজছে একটু রদবদল হয়ে পুরোনো দিনের বাংলা গানের লাইন। ‘ভুল সবই ভুল। ভুল সবই ভুল। এই যুদ্ধের পাতায় পাতায় যা লেখা ছিল তার অনেককিছুই ভুল।’
এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাচ্ছে। শুরুতে ওয়াশিংটন এই যুদ্ধকে এমনভাবে তুলে ধরেছিল যেন খুব দ্রুত কৌশলগত ভারসাম্য বদলে যাবে এবং তেহরান দুর্বল অবস্থায় পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাস ধরে হোয়াইট হাউস দাবি করে আসছিল, সঙ্ঘাত শুরু হলে প্রথম দিনেই বা সর্বোচ্চ দ্বিতীয় দিনের মধ্যেই ইরান প্রায় সম্পূর্ণ পরাজয়ের মুখে পড়বে। মনে করা হয়েছিল খুব দ্রুত ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে পড়বে এবং সরকারও বড় ধরনের অস্থিরতায় পড়ে যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একেবারেই ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে। আরটি ডট কমে প্রকাশিত ‘ইরান ওয়ার রিয়্যালিটি চেক হোয়াই দ্য ইউএস মিসক্যালকুলেটেড তেহরানস পলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক নিবন্ধে এই কথাগুলো লিখেছেন ফারহাদ ইব্রাগিমভ। তিনি মস্কোর রুডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনুষদের প্রভাষক। পাশাপাশি মস্কোর রাশিয়ান প্রেসিডেনশিয়াল একাডেমি অব ন্যাশনাল ইকোনমি অ্যান্ড পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি আরো বলেন, প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও ইরানে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো আলামতই দেখা যায়নি। বরং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সামরিক অবকাঠামো সচল আছে। সরকার পরিচালনার কাঠামোও ঠিকভাবে চলছে। বরং এখনকার পরিস্থিতি বলছে ওয়াশিংটনের প্রথম দিকের হিসাব ছিল অতিরিক্ত আশাবাদী। ইরানের স্থিতিশীলতার পেছনে যে মৌলিক শক্তিগুলো আছে সেগুলো আমেরিকার হিসাবের বাইরে ছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শহীদ হওয়ার পরও এই কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
আমেরিকার ধারণা ছিল, ইরানের শাসনব্যবস্থা এতই নড়বড়ে নাজুক যে বড়সড় ধাক্কা লাগলেই তা উঁই খাওয়া খাম্বার মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়বে। তাদের যুক্তি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দিলে দেশটিতে এক ধরনের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ বা চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে। ক্ষমতাসীন সামরিক-বেসামরিক এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা অর্থাৎ এলিটরা সমন্বয় হারাবেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়বে। পুরো রাষ্ট্র কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়বে। এই দৃশ্যপট অনেকটা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো হবে বলেই তারা ধরে নিয়েছিল। সেখানে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য দেশ এক গভীর সঙ্কটে ডুবে যায়।
কিন্তু ইরানের ঘটনাপ্রবাহ একেবারেই আলাদা ছবি দেখাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখনো কাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে। সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াও চালু আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। এতে বোঝা যায় ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো শুধু একজন নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা সঙ্ঘাতের সময়েও স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে।
এই সময় বিশেষজ্ঞদের পরিষদ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেছে। শহীদ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে এই পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিষ্ঠানগত ব্যবস্থা এখনো স্থিরভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।
আধুনিক ইতিহাসে ইরান এর আগেও বহু বড় চাপের মুখে পড়েছে। আশির দশকের ভয়াবহ ইরান ইরাক যুদ্ধ। দশকের পর দশক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা। আঞ্চলিক নানা সংকট। প্রতিটি সময়ই ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া রাষ্ট্র কাঠামোর সহনশীলতা পরীক্ষা হয়েছে। এই মডেল ধর্মীয় বৈধতা এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একসাথে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি রয়েছে নমনীয় শাসন কাঠামো যা বাইরের চাপের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
বর্তমান সঙ্কটও সেই কাঠামোর আরেকটি বড় পরীক্ষা। এখন পরিস্থিতি যত এগোচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে আমেরিকার দ্রুত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের আশা ভুল ছিল। ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বাস্তবতা অবমূল্যায়ন করেছে। যদি বড় ধরনের অস্থিরতা ছাড়াই এই সঙ্কট শেষ হয় তবে তা প্রমাণ করবে ইসলামী বিপ্লবের পর তৈরি রাষ্ট্র মডেলটি বেশ শক্তিশালী। বরং এমন সঙ্কট অনেক সময় উল্টো ফল দেয়। ভেতরের ঐক্য আরো শক্তিশালী হয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থাও আরো সংহত হয়ে ওঠে।
যেসব দেশের ইরান নিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে তাদের কাছে এই বিষয়গুলো নতুন নয়। যেমন রাশিয়া ও চীন। এই দুই দেশের সাথে তেহরানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তারা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সূক্ষ্ম দিকগুলো বোঝে। বাইরের হুমকির মুখে দ্রুত জনসমর্থন সংগঠিত করার ক্ষমতাও বোঝে। একই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতাও বোঝে। তাই এই দেশগুলোর বিশেষজ্ঞরা ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও সতর্ক মূল্যায়ন করেছেন।
আমেরিকান নেতৃত্বের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যগুলো একটু কাছ থেকে দেখলেই বোঝা যায় তার প্রশাসনের ভেতরে রাজনৈতিক ও মানসিক অস্থিরতা রয়েছে। প্রথমত হোয়াইট হাউসের বক্তব্যগুলো একে অপরের সাথে মেলে না। লড়াই শুরুর পর থেকে আমেরিকার ভাষা ও বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন এসেছে।
প্রথমে বলা হয়েছিল ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশলগত লক্ষ্য হলো শাসনব্যবস্থা বদলে দেয়া। কিছুদিন পর বলা হলো মূল লক্ষ্য শুধু ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করা। তারপর আবার শোনা গেল, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথা। এরপর দেখা গেল আবেগপূর্ণ মন্তব্য। অপমানজনক ভাষা। কখনো পুরো জাতির বিরুদ্ধে। কখনো তাদের রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে। আবার কখনো সরাসরি ইরানের নেতাদের লক্ষ্য করে।
এই পরিবর্তনশীল ভাষা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিষয়টি শুধু ট্রাম্পের মধ্যেই সীমিত নয়। তার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও একই অসঙ্গতি দেখা যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত সপ্তাহে একের পর এক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। একবার এক ধরনের অবস্থান নিয়েছেন। পরে তা বদলেছেন। আবার কিছু সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট করে দেয় পরিষ্কার কোনো কৌশল নেই। ট্রাম্প যতই বলুন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে এবং পরিকল্পনা সফল হচ্ছে বাস্তবতা তার সাথে ততই তীব্র বিরোধ তৈরি করছে।
একটি উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্প ইরানের পরিস্থিতির সাথে ভেনেজুয়েলার তুলনা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এই তুলনা টেকে না। দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা। মনে হয় নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনায় নিজেদের কৌশল সফল হয়েছে বলে মনে করে হোয়াইট হাউস একই পদ্ধতি তেহরানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চেয়েছিল। ধারণা ছিল বাইরের চাপ বাড়িয়ে এবং ভেতরে অস্থিরতা উসকে দিয়ে খুব দ্রুত শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলা যাবে। কিন্তু এই ধারণা ইরানি রাষ্ট্র কাঠামো সম্পর্কে গভীর ভুল বোঝাবুঝির পরিচয় দেয়। যদি এই ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করেই আমেরিকার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে তবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নীতির জন্য তার ফল খুব গুরুতর হতে পারে।
ইরানের নেতৃত্বের ওপর হামলার হুমকি থাকা সত্ত্বেও দেশটির রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে আতঙ্ক বা অচলাবস্থার লক্ষণ দেখা যায়নি। আরো বড় বিষয় হলো, বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপট। গত কয়েক দশকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করেছে। কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা। জাতিগত উত্তেজনা উসকে দেয়ার চেষ্টা। এমনকি রঙিন বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু এই কোনো কৌশলই ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান আগ্রাসনকে শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটিকে আমেরিকার দুর্বলতার চিহ্ন হিসেবেই দেখা যেতে পারে। যখন অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধের সব পদ্ধতি ব্যর্থ হয় তখন সামরিক শক্তি শেষ অস্ত্র হয়ে ওঠে। অন্য কথায় ইরানের বিরুদ্ধে এই হামলা এখন অনেকটা এমন সংকেত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো বৈশ্বিক প্রাধান্যের মডেল বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। এই সীমাবদ্ধতা যত স্পষ্ট হচ্ছে ততই আমেরিকান নেতৃত্বের ভাষা আরো উদ্বিগ্ন এবং পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে এখন পরিষ্কার যে ইরানকে দ্রুত দুর্বল করার ওয়াশিংটনের আশা পূরণ হচ্ছে না। বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র আরেকটি কঠিন পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই পরীক্ষার ফল যদি বড় ধরনের অস্থিরতা ছাড়া শেষ হয় তবে তা আবারো দেখাবে বাইরের চাপের মুখেও তেহরানের রাষ্ট্র কাঠামো কতটা শক্ত।
পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য দিন দিন যেন সত্যি হয়ে উঠছে সেই পুরোনো গানের কথা। ‘মা আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল/ সকলি ফুরায়ে যায় মা।’



