হোয়াইট হাউসের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আগামী সপ্তাহে নরওয়ের অসলোতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচির সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয় আলোচনা হবে। বিষয়টির সাথে জড়িত দু’টি সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে ইরানের জনপ্রিয় দৈনিক হামশাহরি অনলাইন জানিয়েছে, সূত্রগুলো বলেছে যে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকের চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। যদি বৈঠক হয়, তবে এটি হবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক আলোচনা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর সামরিক হামলার নির্দেশ দেয়ার পর এটাই হবে প্রথম সংলাপ।
সূত্রগুলো দাবি করছে, ১২ দিনের ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তী সময়েও উইটকফ ও আরাগচির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের আগ্রাসনের আগে মাসকট ও রোমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাঁচ দফা পরোক্ষ আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু তেহরানের ‘শূন্য শতাংশ সমৃদ্ধকরণ’ বা জিরো পারসেন্ট এনরিচমেন্ট নীতিতে ওয়াশিংটন অনড় থাকার কারণে এসব আলোচনা অচল হয়ে পড়ে।
তেহরান বারবারই বলেছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো ইচ্ছাই নেই। ইরানি কর্মকর্তারা একাধিকবার স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা কখনো তাদের লাল রেখা বা রেড লাইন থেকে পিছিয়ে আসবে না। ‘চুক্তি হোক বা না হোক’ ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
ইসরাইল গত ১৩ জুন ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাসহ আবাসিক এলাকায় বিমান হামলা চালায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সাথে যুক্ত তিনটি প্রধান স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় এবং এগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ওয়াশিংটনের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ’র মহাসচিব রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তেহরান কয়েক মাসের মধ্যেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার তৎপরতা শুরু করতে পারবে।
গ্রোসি নিশ্চিত করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির একটি অংশ এখনো অক্ষত রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘তারা কয়েকটি সেন্ট্রিফিউজ চেইন স্থাপন করতে পারবে এবং কয়েক মাস, এমনকি তার চেয়েও কম সময়ের মধ্যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন শুরু করতে সক্ষম হবে।’
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক গোয়েন্দা মূল্যায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর হামলায় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানলেও দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল উপাদান ধ্বংস হয়নি। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মাত্র কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেছে।
নতুন এই মূল্যায়ন তৈরি করেছে পেন্টাগনের গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা ডিআইএ। এক সূত্র জানিয়েছে, এই মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম পরিচালিত হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে।
ক্ষয়ক্ষতির বিশ্লেষণ এবং ইরানের পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে এই হামলার প্রভাব নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। নতুন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে এই মূল্যায়নের পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে প্রাথমিক ফলাফলগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার দেয়া বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এসব বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামলায় ইরানের সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
মূল্যায়নের সাথে পরিচিত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস হয়নি। এদের একজন আরো বলেছেন, সেন্ট্রিফিউজগুলোও ‘প্রায় অক্ষত’ রয়ে গেছে। ওই ব্যক্তি আরো বলেছেন, ‘তাই ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স অ্যাজেন্সির মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ কয়েক মাসের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলম্বিত করতে পেরেছে।’
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সিনেটররাও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রোধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সফলতা নিয়ে একমত নন।
অনেক রিপাবলিকান বলছেন, তারা বিশ্বাস করেন যে হামলাগুলো তাদের ভাষায়, ইরানের পারমাণবিক বোমা বানানোর কর্মসূচিকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক হুমকি পুরোপুরি দূর হয়নি বলেও কয়েকজন স্বীকার করেছেন। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। তাদেরই একজন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেবল কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে।
এদিকে, প্রতিবেদনগুলো আরো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরানের অন্যতম বৃহত্তম পারমাণবিক স্থাপনায় শক্তিশালী বাঙ্কার-ব্লাস্টার বোমা ব্যবহার করেনি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই স্থাপনাটি এত গভীরে অবস্থিত যে শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার মতে, এই বোমাগুলো ব্যবহার করলেও খুব বেশি কিছু হতো না।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সিনেটরদের ব্রিফিংয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত তিনজন ব্যক্তি এবং বিষয়টির সাথে পরিচিত একজন জানিয়েছেন, কেন ইরানের কেন্দ্রীয় প্রদেশ ইসফাহানের স্থাপনায় বিশাল বাঙ্কার-ব্লাস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়নি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এভাবেই দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, ইসফাহানের ভূ-গর্ভস্থ স্থাপনায় ইরানের প্রায় ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রাখা হয়েছে। অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বি-টু বোমারু বিমান ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় এক ডজনেরও বেশি বাঙ্কার-ব্লাস্টার বোমা ফেলেছিল। কিন্তু ইসফাহান স্থাপনায় কেবল টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। এই ক্ষেপণাস্ত্র একটি মার্কিন ডুবোজাহাজ থেকে ছোড়া হয়।
এই ব্রিফিংয়ে জেনারেল কেইন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগস্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ উপস্থিত ছিলেন।
ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, যখন দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা চলছে তখন ইসরাইলের আগ্রাসনকে সমর্থন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান একে ‘কূটনীতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সিবিএসকে দেয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে আরাগচি ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের গভীর অবিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘মূল বিষয় হচ্ছে, ইরান কি আবারো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস রাখবে এবং নতুন আলোচনায় ঢুকবে? আগের আলোচনায় বাস্তবতা হলো, তারা কূটনীতির মূলনীতি ভঙ্গ করেছে। সংলাপ, আলোচনা ও কথোপকথনের আড়ালে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, এবং আমার মতে, যুক্তরাষ্ট্র খুব খারাপ নজির তৈরি করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র আবারো আমাদের কূটনীতির পথে ডাকছে। ইরান তো সেই পথেই ছিল। কূটনীতি থেকে আমরা বের হইনি। যদি যুক্তরাষ্ট্র আবারো কূটনীতির পথে পা বাড়াতে চায়, তাহলে ইরানকে নিশ্চিত হতে হবে যে, আগের মতো মাঝপথে সামরিক অভিযান চালিয়ে কূটনীতিকে ভণ্ডুল করা হবে না।’
আরাগচি ‘কূটনীতির দরজা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি’ উল্লেখ করে আরো বলেন, তিনি মনে করেন না যে ‘এত দ্রুত এবং এত তাড়াতাড়ি’ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু হতে পারে। ‘আমরা এখন যুদ্ধ-পরবর্তী দিনগুলোতে আছি। মানুষের মধ্যে আবেগ তুঙ্গে। তারা তাদের শহীদদের জন্য শোক করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।’
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মজিদ তাখত রাভানচি এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের আস্থার ঘাটতি সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখনো কূটনীতির ওপর আস্থা রাখছে।



