মিসরের সাথে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে পুনরায় চালু হওয়ার পর আরো ২৫ জন ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরেছেন। দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রা শেষে বৃহস্পতিবার ভোরে তারা গাজা ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। এ সময় বিদেশে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীদেরও সীমান্তে নেয়া হচ্ছে। তবে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ চলাকালেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সময় ভোর ৩টায় তৃতীয় দফায় প্রত্যাবর্তনকারী এই ২৫ জন ফিলিস্তিনি গাজায় প্রবেশ করেন। মিসরের এল আরিশ শহর থেকে যাত্রা শুরু করার ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর তাদের বাসে করে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে নেয়া হয়।
ফেরার পথে ইসরাইলি নিরাপত্তা তল্লাশিতে জিজ্ঞাসাবাদ ও অপমানের শিকার হওয়ার কথা জানান প্রত্যাবর্তনকারীরা। আল জাজিরাকে তারা বলেন, এই যাত্রা ছিল শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।
এর কয়েক ঘণ্টা পর সাতজন ফিলিস্তিনি রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা ১৪ জন স্বজনকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য রাফাহ সীমান্তের দিকে পাঠানো হয়।
প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য ছিল আবেগঘন। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পাশাপাশি নিজ ভূমিতে যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেন তারা। রয়টার্সকে আইশা বালাউই নামের এক প্রত্যাবর্তনকারী বলেন, “ফিরে এসে একসঙ্গে আনন্দ আর গভীর দুঃখ অনুভব করছি। পরিবারকে পেয়ে খুশি, কিন্তু দেশের এই ধ্বংস আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “বিদেশে নিরাপদে ছিলাম, কিন্তু শান্তি পাইনি। কারণ সেটি আমার জায়গা ছিল না। আমার জায়গা এখানেই—গাজা।”
‘মানবিক করিডরের বদলে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার’
গাজায় যাতায়াতের একমাত্র পথ রাফাহ সীমান্ত যুদ্ধের অধিকাংশ সময় ইসরাইল বন্ধ করে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী সীমান্তটি সোমবার (৩ফেব্রুয়ারি) আংশিকভাবে পুনরায় চালু হয়।
এই সীমান্ত দিয়ে কেবল যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ফেরার অনুমতি দেয়া হচ্ছে এবং উভয় দিকের যাত্রীদের কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রত্যাবর্তনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া ছিল অপমানজনক ও নির্যাতনমূলক।
এর আগে ফিরে আসা কয়েকজন ফিলিস্তিনি নারী আল জাজিরাকে জানান, তল্লাশির সময় তাদের হাত বেঁধে চোখ ঢেকে রাখা হয় এবং পূর্ণাঙ্গ দেহ তল্লাশি করা হয়।
ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক কমিশন (ICSPR) বলেছে, ইসরাইলি কড়াকড়ির কারণে রাফাহ সীমান্ত মানবিক পথ না হয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে।
রোগী স্থানান্তরে ধীরগতি
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্ত খোলার পর গুরুতর রোগীদের স্থানান্তরের গতি প্রতিশ্রুত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে প্রতিদিন ৫০ জন রোগীকে বিদেশে পাঠানোর কথা থাকলেও এ সপ্তাহে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ জনকে স্থানান্তর করা হয়েছে।
গাজার বাইরে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে প্রায় ২০ হাজার রোগীর। এই হারে স্থানান্তর চললে সব রোগীকে পাঠাতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে বলে জানান আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের বোমা হামলায় গাজার ২২টি হাসপাতাল অচল হয়ে পড়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৭০০ স্বাস্থ্যকর্মী।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা
এদিকে দক্ষিণ গাজায় প্রত্যাবর্তন চলাকালেই ইসরাইলি বাহিনী হামলা অব্যাহত রেখেছে। বৃহস্পতিবার খান ইউনিসের বানি সুহাইলা এলাকায় গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং একটি শরণার্থী তাঁবুতে গুলিবিদ্ধ হন ২৮ বছর বয়সী এক নারী।
এ ছাড়া মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এবং গাজা শহরের পূর্ব তুফ্ফাহ এলাকায় বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় ওই এলাকার বাসিন্দারা কার্যত আটকা পড়েছেন—হয় ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকার কাছে অবস্থান করতে হচ্ছে, নয়তো নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।



