রাতের আকাশ কেঁপে উঠেছিল বিস্ফোরণের শব্দে। ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত চারটি শহরে হঠাৎ করে বিস্ফোরণের পর এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল গোটা জাতি। এ সময় এর স্টুডিওতে হাজির হন ইরানের রাষ্ট্রী সম্প্রচার সংস্থা আইআরইআইবি-র রাজনৈতিক উপপরিচালক হাসান আবেদিনি। সংবাদ উপস্থাপক মেহদি খোসরাভির সঙ্গে সরাসরি সংলাপে তিনি ব্যাখ্যা করেন—এই সংকটময় মুহূর্তে কীভাবে তথ্য পরিবেশন করছে ইরানি জাতীয় গণমাধ্যম।
আবেদিনি বলেন, "আজ ভোররাতে—বাংলাদেশ সময় আনুমানিক সাড়ে ৫টায়—ইহুদিবাদী ইসরাইল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কিছু অঞ্চলে সামরিক হামলা চালিয়েছে। প্রথম ধাপে মনে হচ্ছে তারা লক্ষ্য করেছে আমাদের পরমাণু বিজ্ঞানী, কৌশলগত গবেষক ও সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের।"
তিনি জানান, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার অধিকাংশই অপ্রমাণিত এবং 'তথ্যদূষণ' (information pollution) তৈরি করতে শত্রুর একটি পরিকল্পিত কৌশল। "দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই প্রথম পর্যায়ে শত্রুর একটি কৌশল হলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা—নানা নাম, স্থান ও ঘটনা ছড়িয়ে জনমনে ভীতি ও সন্দেহ তৈরি করা।"
আইআরআইবি-এর অবস্থান খুবই স্পষ্ট—সত্য যাচাই ছাড়া কিছুই সম্প্রচার করা যাবে না। হাসান আবেদিনি বলেন, "আমরা একমাত্র তখনই কিছু প্রচার করি, যদি আমাদের নিজস্ব সাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তা প্রত্যক্ষ করে অথবা আমাদের ক্যামেরাম্যান সে দৃশ্য ধারণ করে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বিশ্বজুড়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে জাল চিত্র ও ভুয়া ভিডিও তৈরি করা খুব সহজ। ফলে অনেক সময় এমন ছবি ছড়িয়ে পড়ে যেগুলো বাস্তব নয়। আমরা এই দিকটি মাথায় রেখেই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছি।"
আইআরআইবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নাতান্জ, খোন্দাব (আরাক) এবং আরও দুই-তিনটি শহরে বিস্ফোরণের খবর শোনা গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা মাত্রই সংবাদদাতাদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।
"আমাদের রিপোর্টাররা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছেন। যত দ্রুত সম্ভব সত্য ঘটনা উদঘাটন করে নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা চলছে," বলেন আবেদিনি।
আবেদিনি অভিযোগ করেন, ইহুদিবাদী ইসরাইল মূলত সন্ত্রাসের নীতি নিয়ে চলে, এবং এই সামরিক অভিযান তারই একটি নতুন রূপ। "এই পর্যায়ে তারা কিছু আবাসিক এলাকাও লক্ষ্যবস্তু করেছে—এটা ইসরায়েলের ‘সন্ত্রাসমূলক প্রকৃতি’রই বহিঃপ্রকাশ।"
তিনি বলেন, শত্রুর এই পদক্ষেপ আসলে ‘অভ্যন্তরীণ সংকটকে বহির্বিশ্বে রপ্তানির’ একটি প্রচেষ্টা। তাদের লক্ষ্য—ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভ্রান্তি ছড়ানো।
এই কঠিন সময়ে জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে আইআরআইবি কীভাবে তথ্য পরিবেশন করবে—তা ছিল এদিনের মূল আলোচনা। হাসান আবেদিনির বক্তব্যের সারকথা—"আমরা কোনো উত্তেজনায় গা ভাসাই না, কোনো চাপে মাথা নত করি না। সত্য ছাড়া কিছুই আমাদের জবাব নয়।" আর জাতি তাকিয়ে আছে—কি বলবেন নেতারা, কী ঘটছে পর্দার অন্তরালে, আর কীভাবে সামনে এগোবে ইরান।
এখন পর্যন্ত নিহত শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরিচয়
১. জেনারেল হোসেইন সালামি – ২০১৯ সাল থেকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বা আইআরজিসি -এর প্রধান কমান্ডার ছিলেন।
২. জেনারেল গুলাম আলি রাশিদ – ‘খাতাম-আল-আম্বিয়া’ সদর দপ্তরের প্রধান। তিনি নিজ ছেলেসহ শহীদ হয়েছেন। ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক সামরিক কমান্ড সেন্টার। কৌশলগত সামরিক কমান্ড সেন্টার ‘খাতাম-আল-আম্বিয়া’ ইরানের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, রাডার ও সাইবার প্রতিরক্ষা—সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. ড. মোহাম্মদ তেহরানচি – ইরানের প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। তিনি ইসলামি আজাদ বিশ্বদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলের ছিলেন।
৪. ফেরেয়দুন আব্বাসি– ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা এইওআই-এর সাবেক প্রধান ও সাবেক এমপি। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী এমপির পদমর্যাদা মন্ত্রীর ওপরে। এবং মন্ত্রী হলে তাকে এমপি পদ থেকে সরে যেতে হয়।



