ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়া মালয়েশিয়ায়, জরুরি অবস্থা জারি

বায়ুদূষণের মাত্রা সঙ্কটজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বোর্নিও দ্বীপের সারাওয়াক রাজ্যের সেরিয়ান জেলায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে মালয়েশিয়া।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মালয়েশিয়ার সেরিয়ান শহরে দাবানলের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে
মালয়েশিয়ার সেরিয়ান শহরে দাবানলের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে |সংগৃহীত

মালয়েশিয়ার সেরিয়ান শহরে তীব্র ধোঁয়া ঘন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ছে ধোঁয়া। ঢেকে দিচ্ছে সড়কের পাশের দোকানপাটও। ইন্দোনেশিয়ার ভয়াবহ দাবানল থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসা ধোঁয়ায় সেখানে বায়ুমানের জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বায়ুদূষণের মাত্রা সঙ্কটজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বোর্নিও দ্বীপের সারাওয়াক রাজ্যের সেরিয়ান জেলায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে মালয়েশিয়া।

ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে আছে। ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। বোর্নিও ও সুমাত্রার বিস্তীর্ণ এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আগুনের ধোঁয়া প্রতিবেশী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনেইয়ে ঢুকে পড়ছে।

সারাওয়াকের রাজধানী কুচিং থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সেরিয়ানের অবস্থান। সেখানে বাসিন্দারা সাপ্তাহিক ছুটির স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ঘন ধোঁয়ায় তাদের বাইরে যাওয়ার সময় কমিয়ে আনতে হচ্ছে, যাতে ধোঁয়ার সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এড়ানো যায়।

স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান ৬৪ বছর বয়সী আজেন আনাক কুনক বলেন, ‘এমন ধোঁয়াশা থাকলে আমি খুব কমই বাড়ির বাইরে যাই। শুধু খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বের হই। এরপর সাথে সাথে বাড়ি ফিরে যাই।’

আজেন এএফপিকে বলেন, চলমান ধোঁয়াশার কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি শ্বাসকষ্ট ও গলাব্যথায় ভুগছিলেন। শনিবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান তিনি।

তবে বাড়িতেও ধোঁয়া থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন। ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্তান প্রদেশে আগুন যেখানে জ্বলছে, সেখান থেকে তার বাড়ির দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার।

আজেন বলেন, ‘এমনকি এয়ার কন্ডিশনার চালু করলেও আমি ঘরের ভেতর ধোঁয়ার গন্ধ পাই।’

কালিমান্তানের সাথে সীমান্ত থাকা সারাওয়াকই মালয়েশিয়ায় বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে।

শুক্রবার সেরিয়ান চলতি বছর মালয়েশিয়ার প্রথম জেলা হিসেবে বায়ুর মানের অবনতির কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সেদিন এয়ার পলিউশন ইনডেক্স (এপিআই) ৫০০ ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫১২-তে পৌঁছায়।

মালয়েশিয়ার নির্দেশিকা অনুযায়ী, এপিআই ৩০০-এর বেশি হলে তা বিপজ্জনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। আর ৫০০-এর বেশি হলে সাধারণত স্থানীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

শহরের বাজারগুলোতে স্বাভাবিক ব্যস্ততা কমে গেছে। সেরিয়ানের বিখ্যাত ডুরিয়ান বিক্রেতারাও ক্রেতার অপেক্ষায় সড়কের পাশে ফলের স্তূপ নিয়ে বসে থাকছেন। তবে ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

জেলার মনোরম রাঞ্চান জলপ্রপাতও অস্বাভাবিক নীরব। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে সাধারণত জনপ্রিয় এ স্থানে হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী দেখা গেছে।

সড়কের পাশে ডুরিয়ান বিক্রি করেন ৫৩ বছর বয়সী সিয়াও থিয়েন হা। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থার কারণে তার জীবিকায় ইতোমধ্যেই বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

সপ্তাহের শেষে তার স্বাভাবিক আয় ৪০০ রিঙ্গিত (৯৮ ডলার)। এবার এর অর্ধেক আয় করতেও তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমার আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমি উদ্বিগ্ন। তবে ডুরিয়ানের মৌসুমে আয় করার সুযোগ থাকে। তাই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য ডুরিয়ান নিয়ে এখানে বিক্রি করা ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই।’

শুক্রবারের জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সেরিয়ান জেলার প্রায় ৬৪৭টি স্কুল কমপক্ষে সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। জেলাটির জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ৫৪ হাজার।

কুচিংয়ের সেন্ট জোসেফ প্রাইভেট প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ৬৪ বছর বয়সী সিস্টার ইরমিনা পিটার এএফপিকে বলেন, জরুরি অবস্থা দীর্ঘায়িত হয়ে সারাওয়াকের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে— এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

শুক্রবার রাতে ও শনিবার সকালে সেরিয়ানে বৃষ্টি হয়। চলমান কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরির কার্যক্রমের ফলেই এ বৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। এপিআই কমে ২১৯-এ নেমেছে। তবে সেরিয়ানে জরুরি অবস্থা বহাল রয়েছে।

সিস্টার পিটার বলেন, ‘আমরা চাই না স্কুলগুলো কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়ের মতো হয়ে যাক। তখন আমরা তেমন কিছুই করতে পারিনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক রুটিনে চলতে পারছি না। আমাদের কাজে যেতে হয়, শিশুদের স্কুলে যেতে হয়। এটি আমাদের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলছে।’

সূত্র : বাসস