তাইওয়ানকে ঘিরে সোমবার লাইভ-ফায়ার সামরিক মহড়া শুরু করেছে চীন। বেইজিং জানিয়েছে, এই মহড়ার মাধ্যমে স্বশাসিত দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো অবরোধের অনুশীলন করা হচ্ছে। এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তাইপে, যা একে ‘সামরিক ভীতি প্রদর্শন’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
চীন তাইওয়ানকে তার সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির দখল নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেনি।
সর্বশেষ এই শক্তি প্রদর্শন এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী তাইপেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করেছে।
সোমবার বেইজিং সতর্ক করে বলেছে, তাইপেকে ‘বহিরাগত শক্তির’ অস্ত্র সরবরাহ ‘তাইওয়ান প্রণালীকে আসন্ন যুদ্ধের বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে’। তবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, চীনের সাথে তাইওয়ানের পুনঃএকত্রীকরণ ঠেকানোর যেকোনো প্রচেষ্টা ‘ব্যর্থ হতে বাধ্য’।
এএফপির প্রতিবেদকরা চীনের পিংতান দ্বীপে -যা তাইওয়ানের মূল দ্বীপের সবচেয়ে কাছের চীনা ভূখণ্ড- আকাশে দু’টি যুদ্ধবিমান উড়তে এবং দূরে একটি চীনা সামরিক জাহাজ দেখতে পান।
পর্যটনকেন্দ্রটিতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকলেও মহড়ার বিষয়ে তারা আগে কিছুই জানতেন না বলে জানান।
ইনার মঙ্গোলিয়া থেকে আসা গুও পদবি-ধারী এক পর্যটক বলেন, তার মতে একত্রীকরণ ‘নিশ্চিতভাবেই হবে’। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।
‘লাইভ-ফায়ার প্রশিক্ষণ’
চীন জানায়, সোমবার ভোরে তারা তাইওয়ানের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় পানিসীমায় ‘সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর লাইভ-ফায়ার প্রশিক্ষণ’ শুরু করেছে। এই বড় পরিসরের মহড়ায় ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট, যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান ও ড্রোন অংশ নিচ্ছে।
সামরিক মুখপাত্র শি ই বলেন, ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামে কোডকৃত এই মহড়ায় স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও রকেট ফোর্সের সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো ‘সমুদ্র ও আকাশে যুদ্ধ প্রস্তুতি টহল, সমন্বিতভাবে পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য দখল, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও এলাকার অবরোধ এবং দ্বীপ শৃঙ্খলের বাইরে সর্বমাত্রিক প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন।’
চীনা কর্তৃপক্ষ তাইওয়ান ঘিরে পাঁচটি বৃহৎ এলাকা চিহ্নিত করে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে যুদ্ধ মহড়া পরিচালিত হবে।
তাইওয়ান জানায়, চীনের ঘোষিত মহড়া অঞ্চলগুলোর কিছু অংশ তাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইলের ভেতরে পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বিমান চলাচলে প্রভাব ফেলেছে।
প্রেসিডেনশিয়াল অফিসের মুখপাত্র কারেন কুও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে হুমকি দিতে সামরিক ভয়ভীতি প্রদর্শনের’ জন্য চীনের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে তাইওয়ান সরকার।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সোমবার তারা তাদের উপকূলের কাছে ৮৯টি চীনা সামরিক বিমান শনাক্ত করেছে- যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর এক দিনে সর্বোচ্চ। এছাড়া ২৮টি যুদ্ধজাহাজ ও কোস্টগার্ড জাহাজও শনাক্ত করা হয়েছে।
তাইওয়ানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, চীন মঙ্গলবার ১০ ঘণ্টার জন্য একটি ‘অস্থায়ী বিপজ্জনক এলাকা’ ঘোষণা করেছে, যা ‘এ অঞ্চলের ফ্লাইট পরিচালনায় প্রভাব ফেলতে পারে’।
তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা একটি প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র স্থাপন করেছে, ‘উপযুক্ত বাহিনী মোতায়েন’ করেছে এবং ‘দ্রুত প্রতিক্রিয়া মহড়া’ চালিয়েছে। একইসাথে কোস্টগার্ড জানায়, তারা ‘তাৎক্ষণিকভাবে বড় আকারের জাহাজ মোতায়েন’ করেছে।
তাইপের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির এই মহড়া ‘তাদের আগ্রাসী চরিত্র আরো স্পষ্ট করে তুলেছে এবং শান্তি ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে’।
‘কঠোর সতর্কবার্তা’
চীনা সামরিক মুখপাত্র শি বলেন, এই মহড়া ‘তাইওয়ান স্বাধীনতা’ বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে একটি ‘কঠোর সতর্কবার্তা’ এবং ‘চীনের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য রক্ষায় বৈধ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’।
চীনের সামরিক বাহিনী মহড়া উপলক্ষে একটি পোস্টার প্রকাশ করেছে, যেখানে আগুনে মোড়া তাইওয়ানের ভৌগোলিক অবয়বের ওপর ‘ন্যায়ের তীর’ নেমে আসতে দেখা যায়।
এছাড়া বাহিনীর প্রকাশিত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত ভিডিওতে ঈগল, হাঙর, নেকড়ে ও মৌমাছিকে চীনা সামরিক সরঞ্জামে রূপ নিতে দেখা যায়, যা সমুদ্র ও আকাশপথে তাইওয়ানে আঘাত হানছে।
পিংতানের আরেক দর্শনার্থী, লিন পদবি-ধারী এক নারী বলেন, তিনি ভবিষ্যতে মূল ভূখণ্ড চীন ও তাইওয়ানের একত্রীকরণ দেখতে চান।
সিচুয়ান প্রদেশের ২২ বছর বয়সী এই তরুণী বলেন, ‘আমি আশা করি পরিস্থিতি আরো ভালো হবে, উন্নতি ঘটবে। আর আমাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে।’
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানায়, এই মহড়ার অন্যতম মূল বিষয় হলো তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর ‘অবরোধ’, যার মধ্যে উত্তরের কিলুং ও দক্ষিণের কাওশিয়ুং বন্দর রয়েছে।
চীনের সামরিক বাহিনী সর্বশেষ গত এপ্রিলে তাইওয়ান ঘিরে লাইভ-ফায়ারসহ বড় পরিসরের মহড়া চালায়, যা তাইপে তীব্রভাবে নিন্দা করেছিল।
চীন এ মাসের শুরুতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য ১১০০ কোটি ডলারের বড় অস্ত্র বিক্রি অনুমোদন দেয়ার পর তারা নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় ‘দৃঢ় ও শক্তিশালী ব্যবস্থা’ নেবে।
গত সপ্তাহে বেইজিং ২০টি মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে, যদিও সেগুলোর চীনে তেমন কোনো ব্যবসা নেই বলে মনে করা হয়।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত মাসে বলেন, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা হলে টোকিও সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে- এ মন্তব্যের পর বেইজিংয়ের তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
সূত্র : এএফপি/বাসস



