মিয়ানমারের সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বেসামরিক নেতা হিসেবে বৃহস্পতিবার ( ৬ আগস্ট) প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ড সফর করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে পড়া মিয়ানমারকে আবারো কূটনৈতিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনাই এ সফরের লক্ষ্য।
জেনারেল হিসেবে তিনি ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ওই অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিক নেতা অং সান সু চি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বিভিন্ন পক্ষের সংঘাতে এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ গেছে বলে ধারণা করা হয়।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। গণতন্ত্র পর্যবেক্ষক সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলো ওই নির্বাচনকে প্রহসন বলে অভিহিত করে। তাদের মতে, জান্তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেই এ নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছিল।
এরপর থেকেই প্রতিবেশী থাইল্যান্ড দ্বিপক্ষীয়ভাবে এবং ১১ সদস্যের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানের (আসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস) মাধ্যমে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে আসিয়ান উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনগুলোতে মিয়ানমারের নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানায়নি। তবে গত মাসে ব্যাংককে আয়োজিত এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে যোগ দেন।
সামরিক পোশাক ছেড়ে বেসামরিক পরিচয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই মিন অং হ্লাইং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। এরই মধ্যে তিনি ভারত, ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন এবং আসিয়ান সদস্য লাওস সফর করেছেন।
ব্যাংকক সফরের আগে সোমবার গৃহবন্দী অং সান সু চিকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির সাথে দেখা করার অনুমতি দেয়া হয়।
২০২১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো বিদেশী কর্মকর্তার সাথে তাকে সাক্ষাৎ করতে দেখা গেল।
মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস বলেন, মিয়ানমারকে আবার আসিয়ানে ফিরিয়ে নেয়া হলে পশ্চিমা দেশসহ অন্যদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি পথ খুলে যাবে। তবে ভারত, চীন, রাশিয়া ও থাইল্যান্ডের স্বীকৃতি তারা ইতোমধ্যেই পেয়েছে। ফলে, আসিয়ানের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অপরিহার্য নয়।
স্বাধীন বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, আসিয়ানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য মূলত ‘মর্যাদার প্রশ্ন’।
মিয়ানমারের বর্তমান নেতৃত্ব সংঘাতের অবসানে সব পক্ষের সাথে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসিয়ানের ঘোষিত ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ম্যাথিসন বলেন, ‘তিনি একদিকে নিজেকে আসিয়ানের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে তুলে ধরতে চান। আবার একইসাথে পরস্পরবিরোধীভাবে ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।’
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ
একজন থাই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে জানান, বৃহস্পতিবার ব্যাংককের গভর্নমেন্ট হাউসে মিন অং হ্লাইংকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে।
এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চানভিরাকুলের সাথে একান্ত বৈঠক করবেন।
এছাড়া তিনি একটি ব্যবসায়িক ফোরাম এবং থাই সরকারের আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন। এ সময় দুই দেশ শ্রম সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, মিন অং হ্লাইংকে এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া থাইল্যান্ডের উচিত নয়। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও (আইসিসি) তাকে খুঁজছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের যৌক্তিক কারণ রয়েছে ব্যাংককের।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ দীর্ঘ থাই সীমান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ডে মিয়ানমার থেকে আসা লাখো শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে।
এছাড়া মিয়ানমারের অস্থিতিশীল সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সাইবার প্রতারণা চক্র ও মাদক পাচারকারীদের উপস্থিতিও থাইল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, সাইবার প্রতারক চক্র দমনে মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া আরো অনেক কিছু করতে পারে বলে থাইল্যান্ড বিশ্বাস করে। মিন অং হ্লাইংয়ের সফরে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
এক বিবৃতিতে তিনি অং সান সু চির সাথে রেড ক্রস প্রতিনিধির বৈঠককে স্বাগত জানান। একইসাথে তিনি আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দেশটিতে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে আরো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
তিন বছর আগে থাইল্যান্ডের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদউইনাই ব্যক্তিগতভাবে এক ঘণ্টারও বেশি সময় অং সান সু চির সাথে বৈঠক করেছিলেন। আটক হওয়ার আগে সেটিই ছিল কোনো বিদেশী দূতের সাথে তার সর্বশেষ পরিচিত সাক্ষাৎ।
সূত্র: বাসস



