থাইল্যান্ডে সংসদ নির্বাচন শুরু, ক্ষমতার লড়াইয়ে তিন দল

থাইল্যান্ডে মূলত নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আগে ভোট হচ্ছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২৩ সালে। ওই সময় যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের আগামী চার বছর সংসদের নিম্নকক্ষে থাকার কথা ছিল। কিন্তু চার বছর আগেই হচ্ছে নতুন নির্বাচন। মাত্র তিন বছরে দেশটিতে তিনজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
থাই্ল্যান্ডের একটি কেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন এক নারী
থাই্ল্যান্ডের একটি কেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন এক নারী |সংগৃহীত

পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে বহুল প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। স্থানীয় সময় রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্র খুলে দেয়া হয়, যা চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এই নির্বাচনে প্রগতিশীল সংস্কারপন্থী, সামরিকপন্থী রক্ষণশীল ও জনতাবাদী—এই তিন ধারার রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

থাইল্যান্ডে মূলত নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আগে ভোট হচ্ছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২৩ সালে। ওই সময় যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের আগামী চার বছর সংসদের নিম্নকক্ষে থাকার কথা ছিল। কিন্তু চার বছর আগেই হচ্ছে নতুন নির্বাচন। মাত্র তিন বছরে দেশটিতে তিনজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

থাইল্যান্ডের নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আগাম ভোটপর্বে ইতোমধ্যে ২২ লাখের বেশি ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন। এবার দেশের প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন।

ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আবহের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে। যদিও ৫০টিরও বেশি দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, তবে সারাদেশে সংগঠন ও জনসমর্থনের দিক থেকে পিপলস পার্টি, ভূমজাইথাই ও ফেউ থাই—এই তিনটি দলই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংসদের ৫০০টি আসনের জন্য ভোট হচ্ছে। জনমত জরিপগুলোতে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে—এমন ইঙ্গিত না থাকায় নির্বাচনের পর জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি। সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন।

প্রগতিশীল পিপলস পার্টি, নাত্থাফং রুয়েংপানিয়াওয়ুতের নেতৃত্বে, সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলটি সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে তাদের এই সংস্কারমূলক কর্মসূচি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে অন্যান্য দল জোট বেঁধে পিপলস পার্টিকে সরকার গঠন থেকে দূরে রাখতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

পিপলস পার্টি হলো ভেঙে দেয়া মুভ ফরোয়ার্ড পার্টির উত্তরসূরি। ২০২৩ সালের নির্বাচনে ওই দল সর্বাধিক আসন পেলেও সামরিক নিয়ন্ত্রিত সিনেটের বাধায় সরকার গঠন করতে পারেনি। পরে রাজদ্রোহ আইন সংস্কারের আহ্বানের কারণে সাংবিধানিক আদালত দলটি ভেঙে দেয়।

অন্যদিকে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বাধীন ভূমজাইথাই পার্টিকে রাজতন্ত্র ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। আনুতিন গত সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী হন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী পাইতংতার্ন সিনাওয়াত্রা নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। আস্থা ভোটের হুমকির মুখে তিনি গত ডিসেম্বরে সংসদ ভেঙে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। তার প্রচারের মূল বিষয় অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও জাতীয় নিরাপত্তা, বিশেষ করে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষকে ঘিরে উসকে ওঠা জাতীয়তাবাদী আবেগ।

তৃতীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফেউ থাই পার্টি, কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রার রাজনৈতিক ধারার উত্তরসূরি। দলটি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা থাই রাক থাই পার্টির জনতাবাদী নীতির ধারাবাহিকতা তুলে ধরছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নগদ সহায়তার মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে দলটি। প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে থাকসিনের ভাতিজা ইয়োদচানান ওংসাওয়াতকে।

এবারের ভোটের সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে ভোটারদের জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, ২০১৭ সালে সামরিক সরকারের প্রণীত সংবিধান পরিবর্তন করা হবে কি না।

গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো মনে করছে, নতুন সংবিধান প্রণয়ন সামরিক ও বিচার বিভাগের মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা কমানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে রক্ষণশীলদের আশঙ্কা, সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ দেশকে রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

কেন হচ্ছে আগাম নির্বাচন?

গত বছরের মে মাসে প্রতিবেশী দেশ কম্বোডিয়ার সঙ্গে থাইল্যান্ডের ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। ওই সময় কম্বোডিয়ার হামলায় সীমান্তে এক থাই সেনা নিহত হন। এ ঘটনার পর জুনে কম্বোডিয়ার সঙ্গে আলোচনার কথা বলে দেশটির সরকার প্রধান হুন সেনকে ফোন করেন তৎকালীন থাই প্রধানমন্ত্রী পায়েতোংতার্ন সিনাওয়াত্রা। ওই ফোন কলে হুন সেনকে ‘আংকেল’ হিসেবে ডাকেন তিনি। এবং নিজ দেশের সেনাদেরই সমালোচনা করেন। তাদের মধ্যে হওয়া ওই ফোনকলটি ফাঁস হয়ে যায়, যা প্রধানমন্ত্রী সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

ওই ফোনকলের জেরে প্রধানমন্ত্রী সিনাওয়াত্রার ফিউ থাই পার্টির সবচেয়ে বড় জোট ভুমজাইথাই পার্টি জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়। এতে তার সরকার নড়েবড়ে হয়ে যায়, সরকার সামান্য ব্যবধানে টিকে ছিল।

এমন উত্তেজনার মধ্যে আগস্টে থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত রায় দেয় প্রধানমন্ত্রী নৈতিকতা ভঙ্গ করেছেন। ফলে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব আর থাকবে না।

এর পরের মাস সেপ্টেম্বরে সংসদের দ্বিতীয় বৃহৎ দল ভূমজাইথাই পার্টির অনুতিন চার্নভিরাকুল ‘পোগ্রেসিভ পিপলস পার্টির’ সঙ্গে নতুন জোট গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তবে অনুতিনকে শর্ত দেয়া হয় সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন দিতে হবে।

সবশেষ গত ডিসেম্বরে শর্ত অনুযায়ী অনুতিন সংসদ ভেঙে দেন। এতে নতুন সাধারণ নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হয়।

সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি।