মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি মাসের ১৩ তারিখে যখন চীনের বেজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলেন, চারপাশ তখন ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ বিমানের ইঞ্জিনের কানফাটানো গর্জন আর তীব্র গরম বাতাসে তোলপাড়। ঠিক সেই মুহূর্তে রানওয়ের পাশে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির এক তরুণ সৈন্যকে দেখা গেল একবারে পাথরের মূর্তির মতো অনড়, অবিচল।
ডেইলি মেইলের হোয়াইট হাউস প্রতিবেদকের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া সেই মুহূর্তের ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তেই লাখ লাখ মানুষ তার এই অবিশ্বাস্য আত্মনিয়ন্ত্রণ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেয়া ২৩ বছরের এই তরুণের নাম লিউ জেনচেং। ক্যামেরার সামনে লোহা-মানব মনে হলেও সামনাসামনি লিউ অত্যন্ত প্রাণবন্ত আর লাজুক হাসির এক তরুণ। চীনের কূটনীতির প্রবেশদ্বারে পাহারাদারের এই ভূমিকাকে তিনি দেশের প্রথম ‘ভিজিটিং কার্ড’ বা পরিচয়পত্র হিসেবে দেখেন।
লিউ জানান, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু নিজেকে নয়, বরং বিশ্বের বুকে চীনের মর্যাদা ও বিশাল দেশের কূটনীতিকে তুলে ধরেন।
বিমানটি যখন তার মাত্র ২০ মিটারের মধ্যে চলে আসে, তখন বিমানের ইঞ্জিনের গনগনে আঁচ সরাসরি এসে লাগছিল তার পিঠে, কানের ভেতর লেগে যাচ্ছিল তালা। তীব্র বাতাসে শরীর যখন স্বাভাবিক নিয়মেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তে চাইছিল, তখন প্রতিদিনের কঠোর প্রশিক্ষণকে ভরসা করেই নিজেকে খাড়া রেখেছিলেন তিনি। লিউয়ের কাছে এটি নিয়মিত ডিউটির অংশ হলেও, বিশ্ববাসীর কাছে তা ছিল চীনের নিয়মানুবর্তিতার এক নিদর্শন।
এমন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য সৈন্যদের অত্যন্ত কঠিন বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুধু লম্বায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি থেকে ৬ ফুট ২ ইঞ্চির মধ্যে হলেই চলে না, শরীর হতে হয় একদম সুগঠিত- মোটাও নয়, আবার চিকনও নয়।
এরপর শুরু হয় কঠিন সব অনুশীলন। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি কিংবা যেকোনো তীব্র শব্দের মধ্যেও যাতে মনোযোগ ও শারীরিক ভারসাম্য একটুও না নড়ে, সেজন্য প্রতিদিন টানা দুই ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার কঠোর অনুশীলন করতে হয় তাদের। শুধু তা-ই নয়, তীব্র গরমে বা হাড়কাঁপানো শীতেও কোনো বাড়তি আরামদায়ক পোশাক পরার সুযোগ নেই; পরনে থাকে শুধুই নির্ধারিত সামরিক উর্দি আর বুট জুতা। প্রশিক্ষণকে যুদ্ধের ময়দান মনে করেই তারা এই কঠোরতা পার করেন।
আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গত ৮০ বছরের ইতিহাসে বেজিংয়ে এখন এক বিরল কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে বিশ্বনেতারা এখন নিয়মিতই চীনে আসছেন। ভিয়েতনাম, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা তাজিকিস্তানের মতো বন্ধুভাবাপন্ন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের একের পর এক চীন সফর প্রমাণ করে দিচ্ছে যে বিশ্বমঞ্চে চীনের শক্তি কতটা দ্রুত বাড়ছে। এই বিশাল কূটনৈতিক কর্মযজ্ঞের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে পেরে লিউ অত্যন্ত গর্বিত।
নিজের ওপর পূর্ণ আত্মবিশ্বাস রেখে এই চীনা তরুণ স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী দিনেও দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি এভাবেই অবিচল থাকবেন।
সূত্র : গ্লোবাল টাইমস



