গত এক বছর ধরে এবং ইরানের সাথে দু’টি মার্কিন-ইসরাইলি সঙ্ঘাতের গতি-প্রকৃতি দেখে নিজেদের রণকৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে তুরস্ক। বিশেষ করে ইরানের শাহেদ ড্রোনের কার্যকারিতা দেখে আঙ্কারা এখন নিজস্ব ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে মন দিয়েছে, যা আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে।
২০২৪ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে তুরস্ক ও ইসরাইল যখন মুখোমুখি অবস্থানে, ঠিক তখনই তুর্কি সমরাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বাইকার’ তিনটি ভিন্ন ক্ষমতার আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কেইউ-টু, সিবরিসিনেক ও মিজরাক নামের এই ড্রোনগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে দলবদ্ধভাবে শত্রুর ওপর হামলা চালাতে সক্ষম।
আঙ্কারাভিত্তিক বিশেষজ্ঞ হুরশিত দিনগিল জানান, ইরানি ড্রোন কর্মসূচিতে এআই বা নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক আক্রমণের সক্ষমতা এখনো সেভাবে প্রমাণিত নয়, কিন্তু তুরস্ক এই প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে।
বাইকারের তৈরি করা এই ড্রোনগুলোর মধ্যে ‘কেইউ-টু’ বেশ শক্তিশালী। এটি ২০০ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে স্যাটেলাইট নেভিগেশন ছাড়াই প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, এই ড্রোন প্রচলিত কামিকাজে ড্রোনের তুলনায় আলাদা। কেইউ-টুকে বহুমুখী ব্যবহার করা সম্ভব। সাধারণত কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিই করা হয় একবার ব্যবহার করার জন্য, যা লক্ষ্যবস্তুতে আছড়ে পড়ে নিজে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তুরস্কের এই নতুন প্রযুক্তিতে ড্রোনটিকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে, এটি পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
যদি মিশন চলাকালীন ড্রোনটি তার মূল লক্ষ্যবস্তু খুঁজে না পায় কিংবা আকাশপথের পরিস্থিতি প্রতিকূল মনে হয়, তবে এটি নিজেকে ধ্বংস না করে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারে। এতে ড্রোনের ভেতরে থাকা দামি সেন্সর ও প্রযুক্তি রক্ষা পায়। আবার অনেক সময় এটি দূরপাল্লার মিশনে গিয়ে বোমা বা বিস্ফোরক লক্ষ্যবস্তুর ওপর ফেলে সাধারণ ড্রোনের মতো ফিরে আসে। ফলে একে আবারো ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এটি একইসাথে একটি আত্মঘাতী বোমা এবং একটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য আকাশযান হিসেবে কাজ করতে পারে, যা যুদ্ধের মাঠে খরচ অনেক কমিয়ে দেয়।
পাশাপাশি ‘সিবরিসিনেক’ বা মশক ড্রোনটি আকারে ছোট হলেও বেশ ভয়ঙ্কর। মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার ডলার খরচ করে তৈরি এই ড্রোন এক হাজার কিলোমিটারের মধ্যে নিখুঁত হামলা চালাতে পারে। সিরিয়া, ইউক্রেন ও সুদান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার উন্মোচিত হয়েছে ‘মিজরাক’, যা দেখতে অনেকটা ইরানের শাহেদ-১৩৬ এর মতো হলেও এর সক্ষমতা অনেক বেশি। এই ড্রোনগুলো ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা শত্রুর সিগন্যাল জ্যামিং ব্যবস্থার মধ্যেও অনায়াসেই লক্ষ্যবস্তু খুঁজে নিতে পারে।
তুরস্কের এ নতুন রণকৌশলটি মূলত একটি সমন্বিত আক্রমণ পদ্ধতি। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ইউসুফ আকবাবা মনে করেন, তুরস্কের বিখ্যাত বায়রাক্তার টিবি-টু ড্রোনটি এ তিনটি কামিকাজে ড্রোনকে আকাশ থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যুদ্ধের সময় প্রথমে একঝাঁক ‘সিবরিসিনেক’ ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত করে ফেলা হবে। এরপর ‘মিজরাক’ দিয়ে সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে এবং সবশেষে ‘কেইউ-টু’ বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মূল লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
ইরানের শাহেদ ড্রোনের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে তুরস্ক যেভাবে এআই ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে, তাতে আধুনিক ড্রোনের বাজারে আঙ্কারা এখন বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ড্রোনগুলো বাস্তবের জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
সূত্র: মিডলইস্ট আই



