ইলন মাস্ককে টেক্কা দিয়ে বিশ্বে প্রথম বাণিজ্যিক ব্রেন চিপ বসাল চীন

ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষামূলক স্তরের বাইরে এটিই বিশ্বের প্রথম ব্রেন চিপ বা ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস ডিভাইস যা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে বাণিজ্যিকভাবে বেচাকেনা করা যাবে।

বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য একটি রোগীর মস্তিষ্কে কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) চিপ স্থাপন করেছে চীন। দেশটির সাংহাইয়ের হুয়াশান হাসপাতালে এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়ে নিউরোটেকনোলজি বা স্নায়ুপ্রযুক্তির বৈশ্বিক দৌড়ে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরোলিংককে বড় ধাক্কা দিয়ে টেক্কা দিল চীন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এ খবর জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার এক রোগীর মাথায় সফলভাবে কয়েন আকৃতির এই ব্রেন চিপটি বসান চীনা চিকিৎসকেরা। ১০ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে ওই রোগীর হাতের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে ব্রেন চিপ বসানোর পর রোগীর অবস্থা এখন স্থিতিশীল রয়েছে। রোগীর মস্তিষ্ক থেকে উন্নত মানের ও নির্ভরযোগ্য সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।

এই বিশেষ ডিভাইসটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিও’ (NEO)। এটি তৈরি করেছে চীনের স্থানীয় স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান নিউরাকল মেডিকেল টেকনোলজি। এটি মূলত রোগীর হাত নাড়াচাড়ায় সাহায্য করে। চিকিৎসকেরা জানান, চিপটি মস্তিষ্কের কোষ বা টিস্যু ভেদ না করে কেবল ওপরের স্তরে বসে কাজ করে। রোগী যখন হাত নাড়ানোর কথা চিন্তা করেন, তখন তার মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। এ চিপটি নিখুঁতভাবে তা পড়ে পারে। এরপর সেই জটিল স্নায়বিক সংকেতকে ডিজিটাল কমান্ড বা নির্দেশে রূপান্তর করে সরাসরি হাতের পেশিতে পাঠায়। রোগী যখন হাত নাড়ানোর চিন্তা করেন, তখন মস্তিষ্ক থেকে তৈরি হওয়া বৈদ্যুতিক সংকেতটি এই চিপ সরাসরি লুফে নেয়। এরপর মেরুদণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত ও অকেজো স্নায়বিক পথটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে (বাইপাস করে) চিপটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে সেই নির্দেশ সরাসরি হাতের পেশিতে পাঠায়। ফলে প্রাকৃতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও অবশ হয়ে যাওয়া হাতটি আবার নড়াচড়া করতে শুরু করে।"

ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষামূলক স্তরের বাইরে এটিই বিশ্বের প্রথম ব্রেন চিপ বা ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস ডিভাইস যা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে বাণিজ্যিকভাবে বেচাকেনা করা যাবে ।গত ১৩ মার্চ চীনের ন্যাশনাল মেডিকেল প্রোডাক্টস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভাইসটির চূড়ান্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন দেয়। এর সহজ অর্থ, এই প্রযুক্তি আর শুধু ল্যাবরেটরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ট্রায়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইলন মাস্কের নিউরোলিংক যেখানে এখনো শুধু রোগীদের ওপর পরীক্ষামূলক ট্রায়াল চালাচ্ছে, সেখানে চীন একে সরাসরি সাধারণ বাজারের চিকিৎসা পণ্যের মতো বিক্রির উপযোগী চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে ছাড়পত্র দিয়ে মানুষের শরীরে ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। মাত্র চার মাসের মধ্যে এই চিপের উৎপাদন, হাসপাতালে সরবরাহ, রোগী বাছাই এবং স্থানীয় বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার কাজও শেষ করা হয়েছে।

এই সাফল্য বিসিআই প্রযুক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের বড় অগ্রগতির প্রমাণ। চীন এই প্রযুক্তিকে তাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতে বৈশ্বিক স্তরের দুই-তিনটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। এছাড়া ২০২৭ সালের মধ্যে স্নায়ুপ্রযুক্তির একটি উন্নত কাঠামো ও শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তারা।

বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং চিপের উৎপাদন বাড়াতে চীনের নিউরাকল ইতিমধ্যে পুঁজিবাজার থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে, এই খাতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ইলন মাস্কের মার্কিন প্রতিষ্ঠান নিউরোলিংক কিন্তু বাণিজ্যিক দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। তাদের তৈরি চিপ ‘টেলিপ্যাথি’ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাছ থেকে বাজারে বিক্রির চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। তারা বর্তমানে মাত্র ২০ জনের বেশি রোগীর ওপর এর পরীক্ষামূলক ট্রায়াল চালাচ্ছে। তবে মার্কিন এই প্রযুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য অত্যন্ত চমকপ্রদ—পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ যাতে কোনো শারীরিক নড়াচড়া ছাড়াই, স্রেফ মনের ভাবনার জোরে সরাসরি কম্পিউটার, ফোন কিংবা কৃত্রিম হাত-পা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।