ন্যাটো সম্মেলনকে প্রতিরক্ষার সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছে তুরস্ক

আসন্ন ন্যাটো সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে ইউরোপের নিরাপত্তায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে অবস্থান আরো শক্ত করতে চায় তুরস্ক। প্রতিরক্ষা শিল্পকে সামনে তুলে ধরার এটিকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে আঙ্কারা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
তুরস্কের পতাকা
তুরস্কের পতাকা |সংগৃহীত

আসন্ন ন্যাটো সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে ইউরোপের নিরাপত্তায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে অবস্থান আরো শক্ত করতে চায় তুরস্ক। কয়েকটি মিত্র দেশের আপত্তি সত্ত্বেও দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্পকে সামনে তুলে ধরার এটিকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে আঙ্কারা।

দুই দিনের এ সম্মেলন মঙ্গলবার প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামের মাধ্যমে শুরু হবে। এর আগে এটি ছিল পার্শ্ব আয়োজন। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে মূল কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠান তুরস্কের দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রদর্শন করবে।

ইউরোপের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাঠামোর সব ক্ষেত্রেই তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান বলেন, ‘তুরস্ককে ছাড়া ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা কল্পনাই করা যায় না।’

বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের ‘সেইফ’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য জোর দিচ্ছে আঙ্কারা।

তিন লাখ ৫৫ হাজার সক্রিয় সেনাসদস্য এবং আরো তিন লাখ ৭৮ হাজার রিজার্ভ সদস্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুরস্কের। গত এক দশকে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।

তবে, অস্ত্র সরবরাহকারী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের আঙ্কারা প্রধান ওজগুর উনলুহিসারচিকলি বলেন, ‘ইউরোপজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প থেকে তুরস্ককে অনেকটাই বাইরে রাখা হয়েছে। এখন আঙ্কারা সেই অবস্থার পরিবর্তন চায়। আর সে জন্যই এই সম্মেলনে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরবে।’

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অস্ত্রবাজারের ১ দশমিক ৮ শতাংশের অংশীদার তুরস্ক। এ হিসাবে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্বের ১১তম অবস্থানে রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানায়, ২০২৫ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা পণ্য রফতানি ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছর এ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ।

গত মাসে এরদোগান বলেন, ‘আগে এক বছরে যা অর্জন করতাম, এখন তা এক সপ্তাহেই করছি।’

তিনি ড্রোন, ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও যুদ্ধজাহাজ রফতানির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রোমানিয়ায় একটি যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করা হয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশে সামরিক জাহাজ রফতানির ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রথম সাফল্য।

‘ভাবমূর্তি বদলের’ চেষ্টা
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থা এসএসবির প্রধান হালুক গোরগুন গত মাসে ডিফেন্স২৪ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা শুধু সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমরা যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি চাই।’

তবে ইউরোপীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে তুরস্ক কতটা নির্ভরযোগ্য হবে, তা নিয়ে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

উনলুহিসারচিকলি বলেন, ‘রাশিয়ার সাথে তুরস্কের অতীত সম্পর্কের কারণেই তারা এ প্রশ্ন তুলছে।’

তিনি ২০১৭ সালে তুরস্কের রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। এ সিদ্ধান্ত ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করাই এখন তুরস্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

২০১৫ সালে সিরিয়া ও লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইউরোপের সাথে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। পরে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিস ও সাইপ্রাসকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে সেই সম্পর্ক আরো খারাপ হয়।

ইউক্রেনকে তুরস্কের সমর্থনের কারণে সম্পর্কের উন্নতির একটি প্রক্রিয়া শুরু হলেও এস-৪০০ ইস্যু এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সাথে এ নিয়ে মতপার্থক্য কাটেনি। আঙ্কারা এখনো এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে দেয়ার কোনো কার্যকর পথ খুঁজে পায়নি।

আঙ্কারার টিওবিবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুস্তাফা আইদিন বলেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ভালোভাবে এগোলেও পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। কারণ কয়েকটি সদস্য দেশ এখনো বাধা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই জার্মানি ও ফ্রান্স এখনো রাজি নয়। আর এই দু’টি দেশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

‘তুরস্ককে বাদ দেয়া অযৌক্তিক’
‘সেইফ’ কর্মসূচির আওতায় তুরস্কের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল অস্ত্রের যন্ত্রাংশের মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারে।

এই তহবিলের বড় অংশে অংশ নিতে হলে আঙ্কারাকে প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব চুক্তি করতে হবে। এরপর ব্রাসেলসের সাথে বিশেষ প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এর জন্য ২৭টি সদস্য দেশের সবার অনুমোদন প্রয়োজন।

কার্নেগি ইউরোপের জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনান উলগেন বলেন, ‘সেইফ কর্মসূচিতে তুরস্কের প্রবেশের পথে রাজনৈতিক বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, গ্রিস ও সাইপ্রাসের বিরোধ এবং ফ্রান্সের অনীহা।’

তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ও ওয়াশিংটনের সাথে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে থাকা ইউরোপের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্ককে বাইরে রাখা ‘অযৌক্তিক’।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্পেন, রোমানিয়া, পোল্যান্ড এবং বিশেষ করে ইতালি তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে। গত ১৮ মাসে তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কার ইতালির পিয়াজ্জিও অ্যারোস্পেস কিনেছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান লিওনার্দোর সাথে অংশীদারিত্ব চুক্তিও করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে যুক্তরাজ্য তুরস্কের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ‘কান’ (কঅঅঘ) প্রকল্পে সহযোগিতা করছে।

আগামী সপ্তাহের ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ক সফরে এলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এক ব্যাচ জেট ইঞ্জিন সরবরাহের ওপর থাকা বাধা তুলে নেয়া হবে বলে আশা করছে আঙ্কারা। এসব ইঞ্জিন ‘কান’ প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে।

সূত্র: বাসস