মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার দেয়া ভাষণে আমেরিকাকে মানব ইতিহাসের ‘সর্বোচ্চ অর্জন’ বলে অভিহিত করেছেন। একইসাথে তিনি ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আবারো আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।
বজ্রপাত ও ঝড়ের কারণে ওয়াশিংটনে সমবেত জনতাকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেয়ায় কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে শুরু হয় ট্রাম্পের ভাষণ। এতে তিনি দাবি করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্র ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গর্বিত’।
জাতীয় উদযাপনে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে বড় ধরনের সমাবেশের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তবে ৮০ বছর বয়সী এই রিপাবলিকান নেতা মূলত ঐতিহ্যগত দেশপ্রেমমূলক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
ন্যাশনাল মলে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার মানুষের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আড়াই শতাব্দী ধরে আমাদের আমেরিকান প্রজাতন্ত্র মানব ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।’
মঞ্চে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেয়া সাবেক সেনাসদস্যদেরও সম্মান জানান।
তবে কোরীয় ও ভিয়েতনাম যুদ্ধকে তিনি ‘কমিউনিস্টদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে শুক্রবার রাতে মাউন্ট রাশমোর স্মৃতিস্তম্ভে দেয়া ভাষণের একই বার্তা পুনরায় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের যোদ্ধারা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়েছেন। শুধু যাতে সেই হুমকি আবার কুৎসিত রূপে আমেরিকাতেই ফিরে আসে, তার জন্য নয়। আমরা তা হতে দেবো না।’
‘আমেরিকান হতে গর্ববোধ করি’
নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প সম্প্রতি বারবার এ বিষয়টি সামনে আনছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাবিরোধী বামপন্থি অংশ প্রাইমারি নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পাওয়ার পর তিনি এ প্রচারণা আরো জোরদার করেন।
তিনি বলেন, ‘এটা ক্যান্সারের মতো। এটাকে কেটে ফেলতে হবে।’
ট্রাম্প তার ভাষণে সম্প্রতি ইরান ও ভেনিজুয়েলায় চালানো সামরিক অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সামরিক শক্তিকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে’।
তবে ট্রাম্পের স্বাভাবিক ভাষণের তুলনায় এ ভাষণ ছিল সংক্ষিপ্ত। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪৫ মিনিট।
ভার্জিনিয়া থেকে স্ত্রী ন্যান্সিকে নিয়ে অনুষ্ঠানে আসা ৭০ বছর বয়সী রিচার্ড সুলিভান বলেন, ‘আমরা ট্রাম্পকে ভালোবাসি। তার ভাষণও আমাদের খুব ভালো লেগেছে।’
তিনি ‘ফ্রিডম ২৫০’ লেখা টি-শার্ট পরেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এখানে উপস্থিত প্রবীণ যোদ্ধাদেরও সম্মান জানান। তিনি আমাদের আমেরিকান হতে গর্ববোধ করান।’
ভাষণ শেষে শুরু হয় বিশাল আতশবাজির প্রদর্শনী। ট্রাম্প দাবি করেছেন, এটিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আতশবাজির আয়োজন।
১৭৭৬ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে উৎসবে অংশ নেন মানুষ।
দেশটির ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানায়, রাজধানী ওয়াশিংটনে তাপমাত্রা রেকর্ড ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়। ৪ জুলাইয়ের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নিউইয়র্কে আতশবাজির সময়সূচি এগিয়ে আনা হয়। ফিলাডেলফিয়ার একটি কনসার্ট এবং বোস্টনের চার্লস নদীর তীরের উদযাপন থেকেও মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়।
‘অসাধারণ দেশ’
বজ্রঝড়ের আশঙ্কায় ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে ন্যাশনাল মল খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়। এতে কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দেয়।
অনেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করলেও, কেউ কেউ যেতে অস্বীকৃতি জানান। আবার কেউ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় এএফপির সাংবাদিকরা ‘চার্জ!’ এবং ‘ট্রাম্প! ট্রাম্প!’ স্লোগান শুনতে পান।
তবে ট্রাম্প ভাষণ দেয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডে অভিযানে অংশ নেয়া প্রবীণ সেনারা যদি বৈরী আবহাওয়া মোকাবেলা করতে পারেন, তাহলে তিনিও পারবেন।
ওয়াশিংটনের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা র্যান্ডি কোল বলেন, ‘এই অসাধারণ দেশে আমাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার তুলনায় সামান্য গরম সহ্য করা কিছুই নয়।’
তবে ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে এবং নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরার ট্রাম্পের চেষ্টা তার দ্বিতীয় মেয়াদে সৃষ্টি হওয়া গভীর রাজনৈতিক বিভাজনকেই আরো স্পষ্ট করেছে।
শনিবার ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলের কাছে সেই বিভাজনের চিত্রও দেখা যায়। মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে জড়ো হন। তাদের কেউ কনফেডারেট পতাকা বহন করছিলেন। আবার কারো পোশাকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সংগঠন ‘প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট’-এর লোগো ছিল। তারা ‘রিক্লেইম আমেরিকা’ স্লোগান দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু উদযাপনের নয়, আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ।
কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ঘোষিত আদর্শের সাথে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সূত্র: বাসস


