স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কটে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছেন কিউবার মানুষ

কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সঙ্কট ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গত ছয় মাসের জ্বালানি অবরোধ পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

কিউবার প্রধান ক্যান্সার হাসপাতালে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে শয্যাশায়ী রয়েছেন ৬৪ বছর বয়সী রোসা ভ্যালেন্তিনা পেরেজ। দুই বছর আগে তার স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার হয়েছিল।

সম্প্রতি দুই পায়ের চলাচলের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন, ক্যান্সারটি মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে কি-না, তা জানতে জরুরি ভিত্তিতে তার সিটি স্ক্যান করানো প্রয়োজন।

কিন্তু হাভানায় বর্তমানে মাত্র একটি সচল সিটি স্ক্যান মেশিন রয়েছে, সেটিও শহরের নিউরোলজি হাসপাতালে। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকায় আটকে আছেন পেরেজ।

পেরেজ বলেন, ‘এই যন্ত্রণা কতটা অসহনীয়, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। জানি, প্রতিটি দিন আমার জীবন থেকে সময় কেড়ে নিচ্ছে। অথচ হাসপাতাল থেকে শুধু বলা হচ্ছে, ‘দেখি, কবে আপনার স্ক্যান করা যায়।’

পেরেজের জন্ম হয়েছিল সেই সময়ে, যখন ফিদেল কাস্ত্রো যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাসককে উৎখাত করে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিপ্লবের অন্যতম বড় অর্জন ছিল সবার জন্য বিনামূল্যে ও উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা।

এক সময় কিউবার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল দেশটির গর্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক পাঠিয়ে নিজেদের স্বাস্থ্যসেবার সাফল্যও তুলে ধরেছিল কাস্ত্রোর সরকার।

তবে বর্তমানে সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে। কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সঙ্কট ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গত ছয় মাসের জ্বালানি অবরোধ পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে।

নষ্ট ও অচল চিকিৎসা সরঞ্জাম
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ওষুধের তীব্র সঙ্কট, কম বেতনের কারণে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে বা বেসরকারি খাতে চলে যাওয়া এবং পুরোনো চিকিৎসা যন্ত্রপাতির একের পর এক বিকল হয়ে পড়া- সব মিলিয়ে কিউবার হাসপাতালগুলোতে চরম সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

অর্থ সঙ্কটে থাকা সরকার ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিলেও এসব বিভাগও এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অনকোলজি অ্যান্ড রেডিওবায়োলজি (আইএনওআর)-এ বর্তমানে রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা এক হাজার ২০০ জনের বেশি।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক লুইস এদুয়ার্দো মার্টিন জানান, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রায় ৮০ শতাংশ যন্ত্রপাতিই পুরোনো, বিকল অথবা ব্যবহারের অনুপযোগী।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমরা রোগীকে ওষুধ দিচ্ছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে না পারায়, নিশ্চিত হতে পারছি না যে ওষুধ ঠিকমতো কাজ করছে কি-না। কারণ আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপকরণ কিংবা পরীক্ষার যন্ত্রপাতি নেই।’

বাড়ছে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি
চিকিৎসায় অগ্রাধিকার পাওয়া সত্ত্বেও এই সঙ্কটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে শিশুরা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সঙ্কট শুরুর আগে শিশু ক্যান্সার রোগীদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৮৫ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৬৫ শতাংশে।

আইএনওআর-এর শিশু ক্যান্সার বিভাগের প্রধান মারিউস্কা ফোর্তেজা বলেন, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানির অভাবে হাসপাতালগুলোর মধ্যে রক্তের নমুনা পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক জরুরি রক্ত পরীক্ষা নিয়মিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, ‘আপনি জানেন, শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব। তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও ভালো। কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না। এটা চিকিৎসকদের জন্য ভীষণ কষ্টের।’

এমন পরিস্থিতিতে কিউবার দীর্ঘদিনের নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত করেই চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন প্রযুক্তিবিদেরা।

মেরামতকর্মী আলেক্সিস আমাদো দোমিঙ্গেজ বলেন, ‘অনেক সময় রোগীর ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করার জন্য আমাকে রাত ১২টা বা ২টায় হাসপাতালে এসে যন্ত্রপাতি মেরামত করতে হয়।’

হৃদরোগ চিকিৎসাও মারাত্মক সঙ্কটে
হৃদরোগ চিকিৎসাও একই ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওলজি অ্যান্ড কার্ডিওভাসকুলার সার্জারির চিকিৎসক হোসে এস্তেবান আব্রেউ জানান, ২০১৮ সালে যেখানে বছরে ৪০০টির বেশি হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার হতো, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ১০০টিতে।

এছাড়া প্রায় ১৩০ জন রোগী পেসমেকার প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, হার্ট-লাং বাইপাস মেশিন, হার্ট মনিটরসহ অসংখ্য বিকল যন্ত্র মেরামতের অপেক্ষায় পড়ে আছে। অনেক যন্ত্র আবার অন্য যন্ত্র সচল রাখতে খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে খুলে নেয়া হয়েছে।

প্রযুক্তিবিদ লুইস আলেক্সিস ডানকান বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনই নতুন নতুন উপায় বের করতে হয়। উদ্ভাবনী চিন্তা আর সীমিত সম্পদ দিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’

চিকিৎসার সময় কমানো মানেই আয়ু কমে যাওয়া। তবে সব ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

হাভানার প্রায় ৮০ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম মেরামত করা হয় যে কর্মশালায়, সেখানে বিকল ইনকিউবেটর ও নবজাতকের ভেন্টিলেটরের স্তূপ জমে আছে।

অন্যদিকে জনবল সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। অতি স্বল্প বেতন ও কিউবান মুদ্রা পেসোর মূল্যহ্রাসের কারণে বহু চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ সরকারি চাকরি ছেড়ে বিদেশে বা অন্য পেশায় চলে গেছেন।

হাভানার বিখ্যাত হারমানোস আমেইহেইরাস হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটেও একই চিত্র।

সূত্র: বাসস