মার্কিন হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধে ট্রাম্প আটকে গেছেন, সামনে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ আশঙ্কা। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধ আরো অন্তত ছয় মাস চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা। প্যানেটার আশঙ্কা, কোনো সমাধান ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ পরিণত হতে পারে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান, রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, ছয় মাসেরও বেশি আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। বারাক ওবামার আমলে সিআইএ পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা প্যানেটা গার্ডিয়ানকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন ভয়াবহ এক অচলাবস্থায় আটকে গেছে। যুদ্ধ শেষ করার মতো কার্যকর বিকল্প খুবই কম। তাঁর ভাষায়, ‘এই যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু এর কোনো সমাধান হবে না।’ তাঁর আশঙ্কা, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো এটিও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ব্যর্থ যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। এমন সময় প্যানেটার এই মন্তব্য এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসচিব ড্যান ড্রিসকল হঠাৎ পদত্যাগ করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে একের পর এক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা নিয়ে তাঁর বিরোধের খবরের মধ্যেই এই পদত্যাগ।
২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা প্যানেটা বলেন, ‘আমাদের সেনাসদস্যরা এমন এক সময়ে যুদ্ধে যাচ্ছেন, যখন পেন্টাগন ও সামরিক কমান্ড কাঠামোয় ভয়াবহ অস্থিরতা চলছে। এতে মনে হচ্ছে, আসলে দায়িত্বে কেউ নেই।’ তাঁর মতে, ইরানসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা এখন ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছে।
তবে পেন্টাগন এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, হেগসেথের নেতৃত্বে পেন্টাগন ‘পুরোদমে কাজ করছে’। বিভাগের মধ্যে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং দায়িত্ব পালনকারী সামরিক সদস্য ও কর্মকর্তাদের প্রতি অপমান।
প্যানেটার মতে, ট্রাম্প এখন নিজের তৈরি ফাঁদেই আটকে গেছেন। তাঁর সামনে তিনটি পথ। প্রথমত, যুদ্ধ থেকে সরে এসে ব্যর্থতা স্বীকার করা, যা ট্রাম্প করবেন বলে তাঁর মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করা। আর তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা। দ্বিতীয় পথটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করেন প্যানেটা। এতে দুই পক্ষ আলোচনা বা আত্মসমর্পণ কোনোটিতেই না গিয়ে মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে যাবে। আর মধ্যপ্রাচ্য চলবে আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ।
প্যানেটা আরও বলেন, যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে, বারবার এমন ভুল দাবিও করে ট্রাম্প নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন করেছেন।
এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে অস্বীকার করেন। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাত শেষ হবে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর উত্তর তিনি জানেন না, ইরানিদেরই জিজ্ঞেস করতে হবে।
প্যানেটার দাবি, অনেক মার্কিন নাগরিকও ট্রাম্পের এই যুদ্ধ সামলানোর সক্ষমতার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে অধিকাংশ মানুষ ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন এবং যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
তিনি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েনের কথাও উল্লেখ করেন। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে সমর্থন দিতে ২৬০ দিনেরও বেশি সময় বন্দরে না থেমে মোতায়েন থাকার পর যুদ্ধজাহাজটি এ সপ্তাহে থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। জাহাজে জীবনযাত্রার অবনতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নিয়েও খবর এসেছে।
প্যানেটার সোজাসাপ্টা কথা, ‘কোনো পরিকল্পিত পালাবদল ছাড়া মানুষকে অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন রাখা যায় না।’ তাঁর মতে, যুদ্ধ শুধু খারাপই যাচ্ছে না; জীবন বাজি রেখে লড়াই করা মার্কিন সেনাদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও সামরিক বাহিনীর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।



