মৃত্যুদণ্ডে বিতর্কিত পদ্ধতিগুলো ফিরিয়ে আনছে যুক্তরাষ্ট্র

সিদ্ধান্তটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত করা এবং বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ জটিলতা কমিয়ে আনা। যদিও পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশ আইন করে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে অথবা কার্যকর করা বন্ধ রেখেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যবহৃত চেয়ার
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যবহৃত চেয়ার |সংগৃহীত

আমেরিকার ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় বিচার ব্যবস্থায় এক বড়সড় ও হার্ডলাইন পরিবর্তন আসছে। ভয়ঙ্কর অপরাধীদের সাজা কার্যকর করতে সরকার আবারো গ্যাস চেম্বার, ইলেকট্রিক চেয়ার এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মতো পুরোনো ও বিতর্কিত পদ্ধতিগুলো ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দেশটির বিচার বিভাগ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।

তারা জানিয়েছে, এখন থেকে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে দমবন্ধ করা, বৈদ্যুতিক শক দেয়া কিংবা সরাসরি গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে।

মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে যে বিষাক্ত ইনজেকশনের প্রোটোকল ছিল—সেটি তো থাকছেই, সাথে যোগ করা হচ্ছে আরো কিছু অতিরিক্ত ব্যবস্থা। এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত করা এবং বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ জটিলতা কমিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আরটি-এর খবরে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় বসার পরেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে হাঁটবেন। গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর বিচার বিভাগকে তিনি নির্দেশ দেন যেন ধর্ষক, খুনি আর পৈশাচিক অপরাধীদের হাত থেকে আমেরিকানদের বাঁচাতে মৃত্যুদণ্ডের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়।

বিচার বিভাগ বলছে, যারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে এবং যাদের আপিল করার আর কোনো পথ নেই, নতুন এই নীতির ফলে তাদের সাজা কার্যকরের পথ এখন পরিষ্কার হয়ে গেল। যদিও এর আগে ২০২০ সালের একটি নিয়মে বলা ছিল, যে অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে সেখানকার প্রচলিত আইন মানা হবে, কিন্তু এবারই প্রথম ফেডারেল সরকার সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াড বা গুলি করে মারার বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এল।

এই সিদ্ধান্তটি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেয়া নীতির একেবারে উল্টো। বাইডেন ক্ষমতায় থাকাকালীন ফেডারেল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টিতে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। এমনকি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদায় নেয়ার আগে তিনি ফেডারেল ডেথ রো-তে থাকা ৩৭ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। ফলে সেই সময় মাত্র তিনজন আসামি মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় বাকি ছিল। এখন নতুন সিদ্ধান্ত আসার সাথে সাথে দৃশ্যপট বদলে গেল।

আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে মত-পার্থক্য আছে। এক সময়ের ব্যাপক জনসমর্থন এখন আর আগের মতো নেই। ১৯৯৪ সালে যেখানে ৮০ শতাংশ মানুষ এই সাজার পক্ষে ছিল, ২০২৫ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে মাত্র ৫২ শতাংশ মানুষ এটি সমর্থন করছে। অনেকেই মনে করেন এই শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সব সময় সঠিক বিচার হয় না।

বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে আমেরিকার এই অবস্থান বেশ ব্যতিক্রমী। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই এখনো নিয়মিত মৃত্যুদণ্ড দেয়া এবং কার্যকর করা হয়। অথচ পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশ আইন করে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে অথবা কার্যকর করা বন্ধ রেখেছে।

এমনকি রাশিয়ার কথা যদি ধরা হয়, সেখানেও কাগজে-কলমে এই শাস্তি থাকলেও ১৯৯৬ সাল থেকে তা বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও ইদানীং রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনার পক্ষে জনমত বাড়ছে, কিন্তু আইনি জটিলতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে মার্কিন সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে যে, অপরাধ দমনে শাস্তির ধরন আসলে কেমন হওয়া উচিত।