নিউইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এক স্মরণ সভার আয়োজন করা হচ্ছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুপস্থিতি এবং শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির উপস্থিতি ঘিরে ডানপন্থীদের ক্ষোভ আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্প নিউইয়র্কে না গিয়ে হামলার আরেকটি লক্ষ্যস্থল পেন্টাগনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। ২০০১ সালের ওই হামলায় ছিনতাই করা বিমান দিয়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস করা হয় এবং মোট দুই হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন।
নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে আয়োজিত স্মরণ সভায় ট্রাম্পের চার জীবিত পূর্বসূরি- হামলার সময়কালীন প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন, বারাক ওবামা ও বিল ক্লিনটন- এবং বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে কেউ বক্তৃতা দেবেন না। নিহতদের স্বজনেরা একে একে হামলায় নিহত সব ব্যক্তির নাম পাঠ করবেন। হামলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো স্মরণ করতে ঘণ্টাও বাজানো হবে।
৯/১১ মেমোরিয়াল পরিদর্শনে আসা ষাটোর্ধ্ব শিকাগোর বাসিন্দা রবার্ট কাফকা বলেন, ‘এ ধরনের স্মৃতিসৌধ এবং এসব ঘটনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে ঘটনাগুলোকে স্মরণে রাখা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা যাতে আর কখনো না ঘটে, তা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে বোঝাপড়া তৈরি হয়।’
সাবেক প্রেসিডেন্টদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র।
তবে ডানপন্থী নিউইয়র্ক পোস্ট ও সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানির নেতৃত্বে একটি প্রচারণায় মামদানিকে স্মরণ অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়।
এক আবেদনে এক লাখের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, মামদানি এমন কিছু ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত, যারা আমেরিকান প্রতিষ্ঠানকে অবজ্ঞা করে অথবা উগ্র মতাদর্শের যথেষ্ট সমালোচনা করে না।
নগর পরিষদের সদস্য শাহানা হানিফ সিএনএনকে বলেন, ‘মেয়রকে শুধু তিনি মুসলিম হওয়ার কারণে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এটি আমার কাছে উদ্বেগজনক।’
তবে সম্প্রতি মামদানি হামলার পর লোয়ার ম্যানহাটনের বায়ুর বিষাক্ততা সম্পর্কে নগর কর্তৃপক্ষ কী জানত, সে বিষয়ে হাজার হাজার নথি প্রকাশ করে প্রশংসা পেয়েছেন।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধসে পড়ার পর প্রথমে তৈরি হওয়া ধুলোর বিশাল মেঘের পাশাপাশি কয়েক মাস ধরে ওই এলাকায় দূষণ ও ধুলাবালি ছিল। এর ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে এখনো হাজার হাজার নিউইয়র্কবাসী ভুগছেন।
মামদানি মঙ্গলবার বলেন, ‘মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, কারণ তারা যেসব নেতাকে বিশ্বাস করেছিল, তারা মিথ্যা বলে জানিয়েছিল যে ওই বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়া নিরাপদ।’
২০০১ সালের সেই প্রায় মেঘমুক্ত দিনে আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি বিমান ছিনতাই করে। এর মধ্যে দু’টি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে, যার ফলে ওই ১১০ তলা বিশিষ্ট ভবন দু’টি ধসে পড়ে।
তৃতীয় বিমানটি আঘাত হানে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। আর চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
৯/১১ হামলার দিন নিহতদের বাইরে, হামলার কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে আরো নয় হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিতে গঠিত মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের একটি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা জানা গেছে।
বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি মার্কিন নাগরিক ওই ঘটনার সময় জন্মই নেননি অথবা এতটাই ছোট ছিলেন যে ঘটনাটি মনে রাখার বয়স তাদের ছিল না।
৩২ বছর বয়সী লোগান মিলার হামলায় তার চাচাকে হারিয়েছেন। পরবর্তীতে ৯/১১-সংশ্লিষ্ট অসুস্থতায় তার দাদাও মারা যান।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘পরবর্তী প্রজন্মের পক্ষে আসলে কী ঘটেছিল এবং এর প্রভাব একজন মানুষের জীবনে কতটা গভীর হতে পারে, তা কল্পনা করা কঠিন। তাই আমি বরং তাদের আরো বেশি প্রশ্ন করতে দেখি।’
স্মরণ অনুষ্ঠানে লোয়ার ম্যানহাটনে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে সিক্রেট সার্ভিস।
পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ জানান, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে একটি অ্যান্টি-ড্রোন দল মোতায়েন করা হবে। তবে অনুষ্ঠানে হামলার নির্দিষ্ট কোনো হুমকির গোয়েন্দা তথ্য নেই বলেও তিনি জানান।
এদিকে আল-কায়েদা ৯/১১-এর বার্ষিকী উপলক্ষে প্রয়াত নেতা ওসামা বিন লাদেন এবং তার ছেলে হামজার ছবি সম্বলিত একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ট্রাম্প ২০১৯ সালে দাবি করেছিলেন, হামজাও নিহত হয়েছেন।
স্মরণ সভা শুরুর আগে নিউইয়র্ক হারবারের আকাশে দুই হাজার ৯৭৭টি আলোর ড্রোন নিয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। হামলায় নিহত প্রতিটি ব্যক্তির স্মরণে একটি করে আলো জ্বালানো হয়।
সূত্র : বাসস



