নিহত ৯২০

ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, স্বজনদের খোঁজে আকুল হাজারো মানুষ

ভেনিজুয়েলায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৯২০ জন নিহত ও হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন; ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে দেশী-বিদেশী উদ্ধারকারীরা কাজ করছেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
নিহতদের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে
নিহতদের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে |সংগৃহীত

ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত হয়েছে অন্তত ৯২০ জন, আর এখন পর্যন্ত আহত হয়েছে ৩ হাজার ৩৬০ জন। উদ্ধারকারীরা এখনো জীবিতদের সন্ধান করছেন, আর স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের খবর পেতে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছেন।

রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকায় দুটি ভূমিকম্পে বহু ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আহতদের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

সরকারের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শত শত আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী ইতোমধ্যে দেশটিতে এসে পৌঁছেছেন এবং আরো উদ্ধারকারী দল আসছে।

বুধবার কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ভেনিজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫, যা গত এক শতাব্দীতে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি।

কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর উত্তরে অবস্থিত লা গুয়াইরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। এই রাজ্যে দেশের দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দরের একটি এবং দেশের প্রধান বিমানবন্দর সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত।

অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় নিহতের সংখ্যা আনো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

লা গুয়াইরার বাসিন্দা নাতাচা দিয়াজ জানান, তার ২২ ও ২৩ বছর বয়সী দুই মেয়ে একটি ধসে পড়া শপিং সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন। সেখানে তারা ম্যানিকিউরিস্ট (যারা পেশাদারভাবে নখের যত্নে কাজ করেন) হিসেবে কাজ করতেন।

তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার মেয়েদের আবার আমার কাছে ফিরে পেতে চাই। ওরাই আমার সবকিছু, দয়া করে তাদের ফিরিয়ে আনুন।’

শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে এবং অন্তত ১৭২ জন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, শুধু লা গুয়াইরা অঞ্চলেই অন্তত ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, তিনি দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের ভাই।

শুক্রবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, অনেক মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যা আমাদের আনন্দ দেয় যে তারা আবার তাদের পরিবার ও প্রিয়জনদের বুকে ফিরে যেতে পারছেন।

তিনি আরো জানান, প্রাথমিক দুটি ভূমিকম্পের পর থেকে মোট ২১৪টি আফটারশক (পরাঘাত) অনুভূত হয়েছে।

হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও শপিং সেন্টার রয়েছে। তিনি আরো বলেন, অন্তত ১ হাজার অন্যান্য অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যেসব চিকিৎসাকেন্দ্র এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোতে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এই দুর্যোগের আগেও রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেয়া কঠিন ছিল।

চিকিৎসক পেদ্রো হাভিয়ের ফার্নান্দেজ বলেন, ‘আমাদের সব হাসপাতালেই চিকিৎসা-সরঞ্জামের অভাব, ওষুধের অভাব। সাধারণ দিনেও আমরা আমাদের জনগণকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম হই না। এখন এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর জরুরি পরিস্থিতি আরো গুরুতর হয়ে উঠেছে এবং অন্য অনেক দেশের তুলনায় এটি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়া, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাবের কারণে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারীরা খালি হাতেই ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে বের করে আনছেন- এমন খবরও পাওয়া গেছে।

শুক্রবার যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি সামরিক বিমান ভেনিজুয়েলার উদ্দেশে রওনা হয়। বিমানটিতে ব্রিটিশ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর এবং ড্রোন রয়েছে।

এই অভিযানে মার্সিসাইড ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ-এর নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের ১৪টি ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো ও সুইজারল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আরো ঘোষণা দিয়েছে যে তারা যুদ্ধজাহাজ ও পরিবহন বিমান মোতায়েন করবে, পাশাপাশি ১৫ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ত্রাণ সহায়তা প্রদান করবে।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মহাসচিব ইয়ান এগেল্যান্ড বলেন, দশকের পর দশক পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে ভেঙে পড়া অবকাঠামোর কারণে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভেনিজুয়েলা ছিল অপ্রস্তুত ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে।

এর আগে জাতিসঙ্ঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, এই দুর্যোগ ‘বৈশ্বিক সাড়া দাবি করে এবং আমরা সেই সহায়তা সমন্বয় করব ও পৌঁছে দেবো।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি চাই ভেনিজুয়েলার মানুষ জানুক যে তাদের জন্য সাহায্য আসছে।’

লা গুয়াইরা থেকে তিন সহোদর শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ভেনিজুয়েলাজুড়ে মানুষের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তারা ধুলা ও ধ্বংসস্তূপে ঢাকা অবস্থায় ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে।

প্রথম শিশুটি কংক্রিটের বড় বড় খণ্ডের মাঝের একটি ফাঁক দিয়ে জীবিত বেরিয়ে আসতেই একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘কাম হিয়ার মাই চাইল্ড কাম হিয়ার।’

এরপর একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে। তখন ওই ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা কি ভাইবোন?’ উত্তরে সে বলে, ‘হ্যাঁ, আমরা তিন ভাইবোন।”

এর কিছুক্ষণ পর আরৈা কিছুটা কষ্ট করে তাদের তৃতীয় বোনটিও ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসে। সে তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল এবং মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধুলায় ঢেকে ছিল।

এদিকে, ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলার ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রী তাদের মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

হেক্টর বেলো ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ভেনিজুয়েলার সংবাদমাধ্যম যার নাম আন্দ্রেয়া বলে উল্লেখ করেছে, সেই ‘আমার অমূল্য ভালোবাসা’ ভূমিকম্পের সময় তাদের ছোট্ট মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছিলেন।

তিনি আরো লেখেন, ‘আমি আমাদের মেয়েকে একদিন বলব, কিভাবে তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে, প্রিয়। কিভাবে তুমি আমাদের মেয়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলে। তুমি ছিলে এক সাহসী নারী, যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি।’

এছাড়া নিহতদের মধ্যে একজন পর্তুগিজ নাগরিক এবং দুই ব্রাজিলীয় নাগরিকও রয়েছেন বলে তাদের নিজ নিজ সরকার নিশ্চিত করেছে।

স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন স্পেনের নাগরিকও রয়েছেন এবং এখনো ১০৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

ভেনিজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো বলেন, পরপর সঙ্ঘটিত দুটি ভূমিকম্পে দেশের একাধিক অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী কারাকাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে লস পালোস গ্রান্দেস এবং আলতামিরা।

সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্প পরবর্তী আফটারশক (পরাঘাত) মূলত দেশের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লা গুয়াইরা, আরাগুয়া, কারাবোবো এবং ফ্যালকন অঙ্গরাজ্য।

স্পেনে নির্বাসিত অবস্থায় থাকা ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা লিওপোল্ডো লোপেজ বলেছেন, এই ধ্বংস ছিল ‘অত্যন্ত ব্যাপক’ এবং মানুষ ছিল ‘চরমভাবে হতবাক’।

তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা দেখছি অবকাঠামোর সমান্তরাল ধস এবং সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষকে সময়মতো উদ্ধার সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অক্ষমতা।’

তবে তিনি আরো যোগ করেন, ‘ভেনিজুয়েলায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অসাধারণ সহায়তা দেখা যাচ্ছে।’

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন ভেনিজুয়েলা ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ছয় মাসেরও কম সময় আগে ২০১৩ সাল থেকে দেশ শাসন করে আসা বামপন্থী নেতা নিকোলাস মাদুরো কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হন এবং পরে তাকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয় মাদক পাচারের অভিযোগে বিচার মুখোমুখি করার জন্য।

মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন, যা বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে।

তারা আশা করেছিল যে ট্রাম্প প্রশাসন বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ক্ষমতায় আনবে।

সূত্র : বিবিসি