বিন লাদেনকে নিয়ে সিআইএ’র চাঞ্চল্যকর তথ্য

দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতার ফসল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র একে বড় সাফল্য হিসেবে দেখলেও সিআইএ-এর এই নতুন স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, পুরো বিষয়টি কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ওসামা বিন লাদেন
ওসামা বিন লাদেন |সংগৃহীত

আল-কায়েদার সাবেক নেতা ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তার গোপন আস্তানা ছেড়ে পালানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিলেন। মার্কিন কমান্ডো বাহিনী সিলের সেই ঝটিকা অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার এক দশক পর মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

বিন লাদেন যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানকার দুই ভাইয়ের সাথে তার সম্পর্ক বেশ তিক্ত হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে লাদেনকে লুকিয়ে রাখার ‘ভারী বোঝা’ বইতে বইতে ওই দুই ভাই ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারা বারবার লাদেনের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার দাবি জানাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে লেখা চিঠিতে বিন লাদেন তাদের এই দাবি মেনে নেন এবং ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে আস্তানা বদল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ধরা পড়ার আগেই তিনি অন্য কোথাও সরে যাওয়ার ছক কষেছিলেন, যা ওই সময় মার্কিন গোয়েন্দাদের কল্পনার বাইরে ছিল। সিআইএ এখন মনে করছে, অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য দেরি হলে বিন লাদেন হয়তো আবারো হাতছাড়া হয়ে যেতেন।

এই নতুন নথিপত্র যুক্তরাষ্ট্রের আগের অনেক দাবিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আগে ধারণা করা হতো, বিন লাদেন শেষ জীবনে কেবল একজন নামমাত্র নেতা ছিলেন, কিন্তু সিআইএ এখন বলছে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল-কায়েদার মূল কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি কেবল প্রতীকী কোনো চরিত্র ছিলেন না, বরং সংগঠনের কৌশলগত এবং যুদ্ধকালীন সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনিই দিতেন।

সেপ্টেম্বরে হামলার পর থেকে দীর্ঘ এক দশক ধরে একজন বিশ্বস্ত বার্তাবাহককে অনুসরণ করে মার্কিন গোয়েন্দারা অ্যাবোটাবাদের সেই বাড়িটির সন্ধান পান। বাইরের সাথে সব রকম সংযোগহীন এবং উঁচু কাঁটাতারে ঘেরা সেই বাড়িতেই যে লাদেন আছেন, তা নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি।

২০১১ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই অভিযানের সবুজ সঙ্কেত দেন। এরপর ২ মে মধ্যরাতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে পৌঁছায়। অভিযানে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলেও মাত্র নয় মিনিটের মধ্যে ভবনের তিন তলায় বিন লাদেনকে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়।

সেই আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য ও নথিপত্র উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্র, যা পরবর্তীতে আল-কায়েদার অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক বুঝতে তাদের সহায়তা করেছে। লাদেনকে দাফন করা হয় উত্তর আরব সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে।

দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতার ফসল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র একে বড় সাফল্য হিসেবে দেখলেও সিআইএ-এর এই নতুন স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, পুরো বিষয়টি কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল।

সেদিন রাতে যা ঘটেছিল
অ্যাবোটাবাদের সেই নিস্তব্ধ রাত তখন কেবল গভীর হতে শুরু করেছে। ২০১১ সালের ২ মে, ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ১২টা। হঠাৎ নেমে আসে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার। লক্ষ্য সেই রহস্যময় তিনতলা বাড়ি। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি হেলিকপ্টার আছড়ে পড়ে বাড়ির দেয়ালের ওপর। তবে থেমে থাকেনি দুর্ধর্ষ কমান্ডো দল ‘সিল টিম সিক্স’।

হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার বিকট শব্দে যখন চারপাশ কেঁপে উঠছে, তখনই দড়ি বেয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েন কমান্ডোরা। ভেতরটা ছিল গোলকধাঁধার মতো। একতলায় শুরুতেই বাধা হয়ে দাঁড়ান বিন লাদেনের বিশ্বস্ত বার্তাবাহক, কিন্তু কমান্ডোদের নিশানায় নিভে যায় তার প্রাণ। এরপর শুরু হয় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার লড়াই। প্রতিটি তলায় ছড়ানো ছিল উত্তেজনা। দ্বিতীয় তলায় হত্যা করা হয় লাদেনের ছেলে খালিদকে।

কমান্ডোদের লক্ষ্য ছিল একদম ওপরের তলা। সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। তিনতলার অন্ধকার ঘরের কোণে তখন সপরিবারে আল-কায়েদা প্রধান। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে একে একে গর্জে ওঠে সিলের বন্দুক। পুরো এনকাউন্টার শেষ হতে সময় লেগেছিল মাত্র নয় মিনিট। অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষায়, তখনই ওপার থেকে সঙ্কেত আসে ‘জেরোনিমো’। অর্থাৎ, বিন লাদেন নিহত। বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি ধ্বংস করে দিয়ে মাত্র ৩৮ মিনিটের মাথায় লাদেনের লাশ নিয়ে রাতের অন্ধকারে আবারো সীমান্তের দিকে উড়ে যায় দলটি।

সূত্র: ডন