ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট

ঘুম থেকে উঠে অন্য দেশকে হুমকি দেয়ার এখতিয়ার ট্রাম্পের নেই

জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ ‘দিকবিদিকহীন এক জাহাজ’, শান্তির রক্ষকরাই এখন যুদ্ধের মালিকে পরিণত হয়েছে।

লুলার মতে, বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখনকার মতো এত বহুমুখী সংঘাত আর দেখা যায়নি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা |সংগৃহীত

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেছেন, ‘কারো এখতিয়ার নেই সকালে ঘুম থেকে উঠে অন্য একটি দেশকে হুমকি দেয়ার। ট্রাম্প সেই জন্য নির্বাচিত হননি, তার দেশের সংবিধানও তাকে এই অনুমতি দেয় না।’

স্প্যানিশ সংবাদপত্র এল পাইসকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এভাবেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট।

ব্রাজিলের রাজধানী ব্রালিসিয়ার প্লানালতো প্রাসাদে বসে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্ব রাজনীতি, আসন্ন নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। এল পাইসের পক্ষ থেকে এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন প্রধান সম্পাদক জান মার্তিনেজ আহরেন্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা নায়ারা গালারাগা গোরতাজার।

লুলার মতে, বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখনকার মতো এত বহুমুখী সংঘাত আর দেখা যায়নি। গত বছরেই যুদ্ধের পেছনে খরচ হয়েছে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যার অর্ধেক দিয়েও বিশ্বের ক্ষুধা ও নিরক্ষরতা দূর করা সম্ভব হতো।

লুলার ভাষায়, ‘শান্তির রক্ষকরাই এখন যুদ্ধের মালিকে পরিণত হয়েছে।’ জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি একে ‘দিকবিদিকহীন এক জাহাজ’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ১৯৪৫ সালের ভূ-রাজনীতিকে বর্তমান সময়ের জন্য অপ্রাসঙ্গিক বলে দাবি করেন।

ট্রাম্পের নীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা নীতি এবং সামরিক শক্তির আস্ফালনকে ‘বিপজ্জনক খেলা’ বলে বর্ণনা করেন লুলা।

তিনি জানান, ট্রাম্প যখন ব্রাজিলের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তখন তিনি ধৈর্য ধরে তাকে বুঝিয়েছিলেন যে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং সম্মানের মাধ্যমেই প্রকৃত নেতা হওয়া যায়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ বা ইসরাইলের গাজা অভিযানের ক্ষেত্রেও লুলার অবস্থান পরিষ্কার- যেকোনো সমস্যার সমাধান হতে হবে আলোচনার টেবিলে।

ইউক্রেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ভ্লাদিমির পুতিন উভয়েই একে অপরকে দ্রুত ধ্বংস করার যে ধারণা করেছিলেন, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ কেবল ধ্বংসই ডেকে এনেছে।

ব্রাজিলের রাজনীতি এবং লুলার লড়াই
৮০ বছর বয়সী এই নেতা আগামী অক্টোবরে চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। বলসোনারো-পন্থীরা এর আগে লুলার প্রাসাদে হামলা চালিয়ে গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলেছিল।

লুলা দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমরা এই দেশটিকে আর ধ্বংস হতে দিতে পারি না। বলসোনারো মতবাদ আর ক্ষমতায় ফিরবে না কারণ মানুষ গণতন্ত্রকেই বেছে নেবে।’

তিনি আরো যোগ করেন, গণতন্ত্র কেবল ভোট দেয়ার নাম নয়। যদি গণতন্ত্র সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে মানুষ এর ওপর বিশ্বাস হারাবে।

আর্জেন্টিনা ও ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে
আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলের সাথে লুলার সম্পর্ক নেই বললেই চলে। মিলের উগ্র ডানপন্থী নীতি নিয়ে লুলার মন্তব্য, ‘আর্জেন্টিনার মানুষই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।’ অন্যদিকে, ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে তিনি মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন।

লুলার মতে, ভেনিজুয়েলার স্থিতিশীলতার জন্য সেখানে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া জরুরি এবং তা হতে হবে দেশটির অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে, ওয়াশিংটনের নির্দেশে নয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও অনুপ্রেরণা
সাক্ষাৎকারে লুলা তার জীবনের উত্থান-পতনের কথা স্মরণ করেন। ১৯৮২ সালে জীবনের প্রথম নির্বাচনে হেরে যখন তিনি রাজনীতি ছাড়ার কথা ভাবছিলেন, তখন কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। দীর্ঘ কারাবাস এবং ক্যান্সার জয় করে ফেরা লুলার লক্ষ্য এখন ১২০ বছর বাঁচা।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাথে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ ফোরামে যোগ দেয়ার আগে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, ডিজিটাল দুনিয়ার ফেইক নিউজ বা ভিনদেশী হস্তক্ষেপ তাকে বিচলিত করে না। তিনি বিশ্বাস করেন, তার লড়াইটি যুক্তির, যা তিনি আলোচনার টেবিল থেকেই চালিয়ে যাবেন।