‘যুদ্ধ কী করে বাঁধাতে হবে’— এবারে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে পেন্টাগন?

মার্কিন সামরিক অধিপতিরা মুখের কথায় যতই সাফাই বা ব্যাখ্যা দিন না কেন, সচেতন ও পোড় খাওয়া মানুষ তা সহজে বিশ্বাস করবে না; বরং এই ঘটনার আড়ালে তারা গভীর কোনো সামরিক চক্রান্ত ও কৌশলেরই আলামত দেখছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বিতর্কে কেন্দ্র সেই প্রম্পটের ছবি
বিতর্কে কেন্দ্র সেই প্রম্পটের ছবি |সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে 'যুদ্ধ বাঁধাতে' সহায়তা করতে বলা হচ্ছে—মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রকের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের ছবি ঘিরে নেটদুনিয়া জুড়ে এখন তোলপাড়। তবে বিষয়টি যে আদতে এক বিশাল ভুল বোঝাবুঝি, সে দাবি করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। সাপ্তাহিক নিউজউইকের সাম্প্রতিক সংখ্যায় এই খবরের বিশদ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন সামরিক বাহিনীর 'চিফ টেকনোলজি অফিস'-এর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে। হাওয়াইয়ের 'জয়েন্ট বেস পার্ল হারবার-হিকাম'-এ সম্প্রতি এআই টাস্কফোর্সের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে নৌবাহিনীর কর্মীদের জন্য ২০টিরও বেশি কাস্টম এআই এজেন্ট তৈরি করা হয়, যা তাদের দৈনন্দিন কাজ সহজ করবে। পোস্টের সঙ্গে দেওয়া একটি ছবিতে একটি ল্যাপটপের স্ক্রিনে গুগলের 'জেমিনি' ইন্টারফেস দেখা যায়। এতে ইংরেজিতে লেখা একটি প্রম্পট বা কমান্ড চোখে পড়ে—যার অর্থ দাঁড়ায়, 'আমাকে একটি যুদ্ধ বাঁধানোর এজেন্ট বানাতে সাহায্য করো...'।

বিভ্রান্তি নাকি সংক্ষেপ রূপ?

এই ছবি সামনে আসতেই এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তোলেন, এআই-কে দিয়ে কেন যুদ্ধ বা যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে? অবশ্য অনেকেই আবার সামরিক বাহিনীর কাজের ধরন থেকে অনুমান করেন, এটি হয়তো কোনো সংক্ষিপ্ত শব্দ বা অ্যাক্রোনিম।

WAR

বিতর্কের উৎস : একটি এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের ইন্টারফেস, যেখানে লেখা একটি প্রম্পট দেখা যাচ্ছে—যা দেখে মনে হচ্ছে লেখা রয়েছে: "I NEED HELP BUILDING AN AGENT TO CREATE A WAR [...]" (আমাকে একটি যুদ্ধ বাঁধানোর এজেন্ট বানাতে সাহায্য করো...)।

বিতর্কের মুখে মার্কিন সামরিক দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, এখানে 'ওয়ার' (WAR) বলতে কোনো সামরিক সংঘাতকে বোঝানো হয়নি, বরং এটি মার্কিন দপ্তরগুলোর একটি প্রচলিত সংক্ষিপ্ত শব্দ—যার পূর্ণরূপ 'উইকলি অ্যাকশন রিপোর্ট' বা সাপ্তাহিক কাজের খতিয়ান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নৌবাহিনীর লেফট্যানেন্ট কমান্ডার ব্র্যান্ডন মিজুহারা গত ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে নিজ দপ্তরের জন্য সাপ্তাহিক রিপোর্ট তৈরির একটি স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট বানাচ্ছিলেন। তবে তাঁর এই দাবির সপক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি; ফলে সামরিক দপ্তরের এমন বিতর্কিত প্রম্পট ব্যবহার এবং পরবর্তীতে তা ঢাকার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়েছিল, এই উদ্যোগ প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করে দপ্তরকে আরো নিখুঁত ও কার্যকর করতে সাহায্য করছে। ছবিতে দপ্তরকে 'ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার' বলে উল্লেখ করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এ নামটি পছন্দের হলেও মার্কিন কংগ্রেস থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি।

সামরিক খাতে এআই-এর রূপান্তর

ঘটনাটি একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তি হলেও এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এআই ব্যবহারের বাস্তব চিত্রটি ফুটিয়ে তোলে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর তাদের প্রশাসনিক, গোয়েন্দা ও যুদ্ধ পরিচালনার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুততর করছে।

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত এআই স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল অনুযায়ী, ৩ লাখেরও বেশি সেনাসদস্যের জন্য সাতটি প্রধান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে 'এজেন্ট নেটওয়ার্ক' নামের একটি প্রজেক্টের কাজ হলো যুদ্ধ পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইকে যুক্ত করা। আর 'GenAI.mil' প্রজেক্টের মাধ্যমে গুগলের 'জেমিনি' এবং এক্সএআই-এর 'গ্রোক'-এর মতো আধুনিক মডেলগুলোকে সুরক্ষিতভাবে সামরিক ব্যবহারে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

একই সাথে প্রশাসনিক কাজের তদারকি ও দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জন্য ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়। তবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী রূপ অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মল এলাকায় সামরিক কাজে এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের এআই ভাবনা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিতে এআই-কে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের 'এআই অ্যাকশন প্ল্যান'-এ ৯০টিরও বেশি নীতিগত পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এছাড়া গত জুনে ট্রাম্প একটি জাতীয় নিরাপত্তা নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেন, যার মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের কাজে সুরক্ষিত এআই পৌঁছানো, যাতে বাহিনীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরো দ্রুত হয়।

মার্কিন প্রশাসন যে নীতিতেই হাঁটুক না কেন, পেন্টাগন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার আদি পদ্ধতি সম্পর্কে বিশ্ববাসীর অজানা নয়। ইরানের সাথে এখন আমেরিকার তীব্র টানাপোড়েন, হামলা ও পাল্টা হামলার নতুন সমীকরণ আর সেই সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনঘন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তৈরি করেছে চরম অনিশ্চয়তা। এমন এক অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক অধিপতিরা মুখের কথায় যতই সাফাই বা ব্যাখ্যা দিন না কেন, সচেতন ও পোড় খাওয়া মানুষ তা সহজে বিশ্বাস করবে না; বরং এই ঘটনার আড়ালে তারা গভীর কোনো সামরিক চক্রান্ত ও কৌশলেরই আলামত দেখছে।