ইন্টারনেট আসক্তি অভিযোগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্টদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক মামলা শুরু

যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করার অভিযোগে ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক মামলা শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার জন্য আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। মামলায় কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক নকশা ও অ্যালগরিদমই দায়ের বিষয় হিসেবে তোলা হয়েছে, কনটেন্ট নয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

শিশুদের আসক্ত করে তোলার উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে নকশা করা হয়েছে কি না- এ প্রশ্নে একটি ঐতিহাসিক বিচার শুরু হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। লস অ্যাঞ্জেলেসে এই সপ্তাহে শুরু হওয়া মামলাটি ভবিষ্যতে দেশজুড়ে অনুরূপ মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য আদালতে মঙ্গলবার জুরি বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। মামলাটিকে ‘বেলওয়েদার’ মামলা বলা হচ্ছে, কারণ এর রায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া শত শত মামলার গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই মামলার বিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এলফাবেট, বাইটডান্স ও মেটা। এ তিনটি প্রযুক্তি জায়ান্টের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম যথাক্রমে ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম।

মামলার সাক্ষী হিসেবে মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গকে আদালতে তলব করার কথা রয়েছে।

শত শত মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো কিশোর-কিশোরীদের এমন কনটেন্টে আসক্ত করেছে, যার ফলে বিষণ্ণতা, খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ (ইটিং ডিসঅর্ডার), মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

বাদিপক্ষের আইনজীবীরা ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তামাক শিল্পের বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলাগুলোর কৌশল অনুসরণ করছেন। সে সময় তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ‘ক্ষতিকর ও ত্রুটিপূর্ণ পণ্য’ বিক্রির অভিযোগে একই ধরনের গণমামলা হয়েছিল।

বিচারক ক্যারোলিন কুহলের আদালতে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শুরু হওয়ার কথা, জুরি গঠন সম্পন্ন হওয়ার পর।

মামলাটি মূলত একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর কেন্দ্রীভূত, যেখানে কেজিএম নামে পরিচিত (আদ্যাক্ষরে শনাক্ত) এক ১৯ বছর বয়সী তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির ফল।

‘এই প্রথম কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি শিশুদের ক্ষতির জন্য জুরির মুখোমুখি হচ্ছে’

সোশ্যাল মিডিয়া ভিকটিমস ল’ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথিউ বার্গম্যান বলেন, ‘এই প্রথম কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিকে শিশুদের ক্ষতির দায়ে জুরির সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে।’

এই সংস্থাটি বর্তমানে এ ধরনের এক হাজারের বেশি মামলায় যুক্ত।

তিনি বলেন, ‘কেজিএম ও তার পরিবার আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড়, শক্তিশালী ও ধনী কোম্পানিগুলোর সমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে আদালতে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে- এটাই নিজেই একটি বড় বিজয়।’

বার্গম্যান আরো বলেন, ‘আমরা জানি এই মামলাগুলো কঠিন লড়াইয়ের। প্রমাণের ভারসাম্যের ভিত্তিতে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে এসব কোম্পানির পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণেই কেজিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দায়িত্ব আমরা স্বেচ্ছায় ও দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করছি।’

বার্গম্যানের মতে, এই মামলার রায় ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলাগুলোর সমঝোতা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেটা পয়েন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।

গত সপ্তাহে স্ন্যাপচ্যাট নিশ্চিত করেছে, তারা একটি দেওয়ানি মামলার বিচার এড়াতে সমঝোতায় পৌঁছেছে। ওই মামলায় মেটা, টিকটক ও ইউটিউবের সাথে স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধেও তরুণদের আসক্ত করার অভিযোগ ছিল। তবে সেই সমঝোতার শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।

প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো দাবি করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের Communications Decency Act-এর Section ২৩০ আইনের মাধ্যমে তারা ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্টের দায় থেকে আইনি সুরক্ষা পায়।

তবে এই মামলায় যুক্তি দেয়া হয়েছে- সমস্যা কনটেন্ট নয়, বরং ব্যবসায়িক মডেল ও ডিজাইন। অভিযোগ হলো, কোম্পানিগুলো এমন অ্যালগরিদম ও নকশা তৈরি করেছে, যা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেয়।

বার্গম্যান বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট না সরানোর জন্য দায়ী করছি না। আমরা তাদের দায়ী করছি শিশুদের আসক্ত করার জন্য প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করার কারণে এবং এমন অ্যালগরিদম তৈরির জন্য, যা শিশুদের তারা যা দেখতে চায় তা নয়, বরং যা তারা এড়িয়ে যেতে পারে না- তা দেখায়।’

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য আদালতগুলোতেও তরুণদের ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এই প্রতিবেদন তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট কোনো কোম্পানিই মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

সূত্র : বাসস