ইরানের ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানে টানা দ্বিতীয় রাতের হামলায় তারা সেখানে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে |সংগৃহীত

একদিন আগেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ‘কঠোরভাবে আঘাত’ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তার ঠিক পরপরই ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানে টানা দ্বিতীয় রাতের হামলায় তারা সেখানে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত তাদের একটি পোস্টে বিমান হামলার ভিডিও সংকলনও যুক্ত রয়েছে।

সেন্টকম বলেছে, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ‘হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতাকে আরো দুর্বল করা।’

লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণস্থল, নৌ সক্ষমতা এবং ইরানের উপকূলজুড়ে সামরিক রসদ অবকাঠামো।

সেন্টকম বলেছে, ‘সর্বশেষ এই হামলাগুলো ইরানে আগের রাতের সফল আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার পরবর্তী পদক্ষেপ।’

সর্বশেষ হামলার পর ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘গতকাল জাহাজগুলোতে ইরানের বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এটি করা হয়েছে। যদি এমনটা আবারো ঘটে, তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে!’

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর তীরবর্তী বন্দর শহর সিরিক এবং বন্দর আব্বাসসহ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। উপকূলীয় শহর কোনারাক ও চাবাহারের বিভিন্ন স্থানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানা গেছে।

বন্দর আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়াও সিরিক ও জাস্ক বন্দরে দু’টি করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানি হামলার কথা জানিয়েছে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণ, কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার খবর এবং কাতারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে যে, তারা রাতভর কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

তারা এই হামলাকে ‘আমেরিকার চুক্তি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক জবাবের প্রথম ধাপ’ বলে উল্লেখ করেছে এবং সতর্ক করে বলেছে, ‘আগ্রাসন’ অব্যাহত থাকলে অঞ্চলের অন্য মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও হামলার আওতায় আনা হবে।

এদিকে বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি শেষ’ বলার পর, এশীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৯ ডলারে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আবারো ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানিয়ান ব্রডকাস্টিং অ্যাজেন্সি জানিয়েছে যে, সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশের ইরানশাহর বিমানবন্দরের একটি ভবন ও রানওয়েতে বিস্ফোরণের পর শহরটির আকাশে ধোঁয়া দেখা গেছে।

সিস্তান ও বেলুচেস্তানের ডেপুটি গভর্নর এবং ইরানশাহরের গভর্নরের বরাত দিয়ে আইআরএনএ শহরের বিমানবন্দর স্থাপনায় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে যে, এই ঘটনায় একজন দমকলকর্মীও নিহত হয়েছেন।

আবু মুসা দ্বীপেও দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। এ দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর আব্বাসে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।

তবে চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির একটি ব্যারাক ও দফতরে আগুন লাগার কথা জানিয়েছে ইরানের গণমাধ্যম।

ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, চাবাহারে বিচ্ছিন্ন তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দু’টি দ্রুত সচল করা হয়েছে এবং তৃতীয়টিও শিগগিরই সচল হবে।

বুধবার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা তাদের খুব শক্তভাবে আঘাত করেছি। আমি বলব, আমরা তাদের ২০ গুণ বেশি আঘাত করেছি। তারা যতবার আমাদের ওপর হামলা করে, আমরা তাদের ওপর ২০ গুণ বেশি আঘাত হানি।’

তিনি এটাও দাবি করেন, ইরান ‘কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল’ এবং তারা ‘খুবই মরিয়া হয়ে’ একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি না তারা কোনো চুক্তি করার যোগ্য কি-না। সমস্যা হলো, আমি জানি না তারা চুক্তির সম্মান রাখবে কি-না।’

মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে তিনটি ট্যাঙ্কারে হামলার জবাবে তারা ‘শক্তিশালী’ হামলা চালিয়েছে।

গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর গত মঙ্গল থেকে বুধবার পর্যন্ত সময়টি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের।

ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, গত মাসে ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন ‘ভেঙে গেছে’।

তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘গত রাতে তাদের ওপর খুব কঠিন আঘাত করেছে’ এবং ‘সম্ভবত আজ রাতেও তাদের কঠোরভাবে আঘাত করা হবে।’

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তাদের সাথে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা জঘন্য। আপনি জানেন জঘন্য কারা? তারা জঘন্য। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।’

এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা অশ্লীলতার জবাব অশ্লীলতা দিয়ে দেই না, বরং কাজের মাধ্যমে জবাব দেই- নির্ভীকভাবে এবং বীরত্বের সাথে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ওই চুক্তিতে ১৪টি পয়েন্ট ছিল, যার মধ্যে অন্যতম হলো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি- যার মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

এছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার শর্তও ছিল চুক্তিতে।

যদিও আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি, তবুও ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, আরো আলোচনা করা ‘সময়ের অপচয়’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

উল্লেখ্য, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এটিই প্রথম হামলা নয়।

এর আগে গত ২৬ জুন হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছিল।

পরবর্তীতে ২৭ জুন একটি ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনায় আবারো যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। যদিও ওই মাসের শেষের দিকে উভয় পক্ষই ‘শান্ত থাকার’ ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি