সাজাপ্রাপ্ত ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে ফেরত চাইবে বিএনপি সরকার

‘বিএনপি সরকার টিউলিপ সিদ্দিক বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিচার কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে না। যদিও তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পৃথকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তারা দু’জনেই এখন দোষী সাব্যস্ত।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক
বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক |সংগৃহীত

বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে সাজা কার্যকরের জন্য দেশটির কাছে ফেরত চাইবে বলে জানিয়েছেন নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া তারেক রহমানের জ্যেষ্ঠ সহযোগী হুমায়ুন কবির।

ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী ও উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের এমপি টিউলিপের বিচার তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশের আদালতে হয়েছিল এবং তাকে চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। যদিও যুক্তরাজ্য সরকার বলেছে, তারা এই রায়কে স্বীকৃতি দেয় না।

রাজধানী ঢাকায় জমি অধিগ্রহণের চুক্তিতে টিউলিপ সিদ্দিককে তার খালা, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তবে টিউলিপ এই দোষ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ‘তাকে কখনো তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত জানানো হয়নি।’ তিনি এই বিচারকে ‘মিডিয়ার বিচার’ বলে অভিহিত করেছেন।

কিন্তু হুমায়ুন কবির, যাকে তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ব্রিটিশ গণমাধ্যমে দি ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, ‘বিএনপি সরকার টিউলিপ সিদ্দিক বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিচার কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে না। যদিও তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পৃথকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তারা দু’জনেই এখন দোষী সাব্যস্ত।’

বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাজ্যের কোনো প্রত্যার্পণ চুক্তি নেই। যার ফলে টিউলিপ সিদ্দিককে বাংলাদেশে পাঠানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের চুক্তির বাইরেও প্রত্যার্পণ চুক্তি হতে পারে। কিন্তু আইনত সম্ভব হলেও লেবার পার্টি টিউলিপ সিদ্দিককে দোষী সাব্যস্ত করার প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, তারা এই রায়কে স্বীকৃতি দিতে পারে না।

গত বছরের শেষ দিকে দুর্নীতির অভিযোগের সাথে আরো একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর লেবার পার্টি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই মামলায় টিউলিপ সিদ্দিক কোনো ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পায়নি এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য তাকে কখনো জানানো হয়নি।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘টিউলিপের আইনি দলের মাধ্যমে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও এটি করা হয়েছে। যেকোনো অভিযোগের সম্মুখীন যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে তাকে সর্বদা আইনি প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার দেয়া উচিত। যেহেতু এই মামলায় তা ঘটেনি, তাই আমরা এই রায়কে স্বীকৃতি দিতে পারি না।’

তা সত্ত্বেও, হুমায়ুন কবির যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন, তাহলে এই মামলাটি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে।

নতুন সরকার টিউলিপ সিদ্দিক ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা হস্তক্ষেপ করব না। আমরা বিচারিক প্রক্রিয়াকে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে দেবো।’

হুমায়ুন কবির টিউলিপ সিদ্দিককে স্যার কেয়ার স্টারমারের লেবার সরকারের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলে অভিহিত করে বলেন, ‘যুক্তরাজ্য সরকারের অপরাধীদের সম্পর্কে অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাই আমরা আশা করি, যুক্তরাজ্য সরকার যুক্তরাজ্যের মাটিতে আওয়ামী লীগের অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে মোকাবেলা করবে, যারা অর্থ পাচারের কার্যক্রম ব্যবহার করে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে তুলে ধরা এবং অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। আমরা তাদের ফেরত চাই। আমরা ব্রিটিশ সরকারকে একটি তালিকা দেব।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রত্যার্পণের ক্ষেত্রে আমরা চাইব, যুক্তরাজ্য এই অপরাধীদের ট্র্যাক করুক। যদি আমরা অবৈধ অভিবাসন মোকাবেলায় যুক্তরাজ্যের সাথে একটি শক্তিশালী অংশীদার হতে চাই, তাহলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যের ভূখণ্ডে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য কেন আলাদা হতে পারে না?’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থার ১৭ কোটি পাউন্ডেরও বেশি সম্পদ জব্দ করা একটি স্বাগত জানানোর মতো পদক্ষেপ। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশী সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সাথে সম্পর্কিত প্রায় ৩০০টি সম্পত্তি। তবে আরো কিছু করা দরকার।’

মন্তব্যের জন্য টিউলিপ সিদ্দিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, তিনি এর আগেও এ বিচারকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক বলে অভিহিত করেছেন।

টিউলিপ বলেন, ‘এই ক্যাঙ্গারু আদালতের ফলাফল যতটা অনুমানযোগ্য, ঠিক ততটাই অযৌক্তিক। আমি আশা করি, এই তথাকথিত রায়কে তার প্রাপ্য অবমাননার সাথে বিবেচনা করা হবে। আমার মনোযোগ সব সময় হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের আমার ভোটারদের ওপর ছিল এবং আমি বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতিতে বিভ্রান্ত হতে চাই না।’

সূত্র : দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট